অবরুদ্ধ কাশ্মীরে যা দেখলেন বিবিসির সাংবাদিক

268

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্ব থেকে কাশ্মীরকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে ভারত সরকার। যে কারণে উপত্যকা দুটিতে কী হচ্ছে তা সঠিক জানা যাচ্ছে না। এমন একটি সময় সেখানে আছেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির এক সংবাদকর্মী। গত বুধবার তিনিজম্মু-কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে পৌঁছান। তার বর্ণনায়- মৃত্যু উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেছেন তিনি।

বিবিসির ওই সংবাদকর্মী বর্ণনায় মুত্যৃপুরীতে পরিণত হওয়া কাশ্মীরের অবস্থা;


রাস্তাঘাটে একশো গজ পরপরই সেনা চৌকি আর কাঁটাতারের ব্যারিকেড। রাস্তায় যত না সাধারণ মানুষ, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সেনা আর আধা সেনা। মানুষের ছোট ছোট কিছু জটলা। ৩৭০ ধারা এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রাতারাতি বিলুপ্ত হওয়ার পর তারা কতটা বিক্ষুব্ধ, সেটা তাদের চেহারাতেই স্পষ্ট।

এ সময় সেখানকার কয়েকজনের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। তাদের ভাষ্য, দশ মিনিটের জন্য কাশ্মীরে জারি করা কারফিউ তুলে নেয়ার হিম্মত দেখাক সরকার, তারপরই তারা দেখবে দলে দলে কত মানুষ রাস্তায় নামে এর প্রতিবাদ জানাতে।


বিবিসির ওই সংবাদকর্মীর ভাষ্য, প্রতিবাদের বিষয়টি সরকারও জানে, তাই তো গোটা কাশ্মীর উপত্যকা এখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে। ঝিলমের তীরে এখন যে স্তব্ধতা, সেটা যে ঝড়ের আগের, সেটা স্পষ্ট।

এর আগেও বিভিন্ন ঘটনা-বিক্ষোভ-সংঘাতের খবর সংগ্রহ করতে কাশ্মীর গেছেন ওই সংবাদকর্মী। কিন্তু বর্তমান অবস্থা তিনি আগে কখনও দেখেননি। বর্তমান অবস্থার সঙ্গে আগের কোনো কিছুর তুলনা চলে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গত বুধবার কাশ্মীর পৌঁছে লন্ডনে যোগযোগ করে অল্প সময়ের জন্য কথা বলেন বিবিসির ওই সংবাদকর্মী। সংবাদমাধ্যমটি গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের কর্মীর দেওয়া ভাষ্যমতে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। যেখানে আরও বলা হয়েছে, কাশ্মীর এখন এক মৃত্যুপুরী। রাস্তাঘাটে কোনো লোকজন নেই। পুরো রাজ্য জুড়ে আছে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় সেনা। টানা কারফিউ জারি রয়েছে। দোকানপাট বন্ধ।

অনেকের বাড়িতেই খাবার ফুরিয়ে গেছে,রেশন ফুরিয়ে গেছে। কেনাকাটার জন্য তারা সাহস করে কেউ কেউ বেরুচ্ছেন, কিন্তু কিছু কেনার মতো কোনো দোকান খোলা নেই। শ্রীনগরের যেসব জায়গায় তিনি যেতে পেরেছেন, মনে হয়েছে পুরো শহর জুড়ে একটা থমথমে পরিবেশ। চারিদিকে আতংক, ক্ষোভ।

তিনি আরও জানান, সেখানকার রাজনীতিবিদদের প্রায় সবাই কারাগারে কিংবা গৃহবন্দী। গুপকার রোড, যেখানে থাকেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বা মেহবুবা মুফতির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকরা, সেখানে কাউকে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। ডাল লেকের ধারে গভর্নর হাউস, সেদিকেও যেতে দেয়া হচ্ছে না।

গুজবের শহর হয়ে উঠেছে শ্রীনগর। নানা জায়গায় বিক্ষোভ চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু শ্রীনগরের কোথাও বিক্ষোভ দেখতে পাওয়া যায়নি। একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে অনেক ট্যাক্সি চালক বসে ছিলেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা বললেন, এখানে কি করছেন। বেরামিতে যান। ওখানে দশ হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। লোকজন পথে নেমে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু এগুলো সব শোনা কথা, সত্যিই এরকম কিছু ঘটছে কী না, তা যাচাই করার কোনো উপায় নেই।

বিমানবন্দরে নেমে এই সংবাদকর্মী যখন গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, বিবিসির পরিচয়পত্র দেখে তার কাছে কিছু লোক এগিয়ে আসেন কথা বলতে। তারা ৩৭০ ধারা এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘটনায় যে আবেগ দেখিয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য এই সাংবাদিকের।

তাদের ভাষ্য, পার্লামেন্টে অমিত শাহ দাবি করেছেন, কাশ্মীরের ৮০ শতাংশ মানুষ নাকি এটি সমর্থন করে। যদি তাই হবে; সরকার কেন মাত্র আট মিনিটের জন্য কারফিউ তুলে দিচ্ছে না। কারফিউ তুলে নিক, তারপর তারা দেখতে পাবে কীভাবে মানুষ রাস্তায় নামে প্রতিবাদ জানাতে। মানুষ এখানে ভীষণ ক্ষুব্ধ, ভীষণ হতাশ। তারা হাসপাতালে যেতে পারছে না। অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী কিনতে পারছে না। সব জায়গায় গিজ গিজ করছে সেনা। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ। ইন্টারনেট বন্ধ। ল্যান্ডলাইনও কাজ করছে না।

তারা অনুরোধ করেছেন কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি যাতে পুরো পৃথিবীকে দেখানো হয়। তাদের এমন অবস্থায় একটা বিষয় পরিস্কার; যেরকম বিপুল সংখ্যায় কাশ্মীর জুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, তার কারণে কেউ এখন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে পারছে না। কিন্তু পরে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে, সেটা বলা মুশকিল।

কাশ্মীরে এখন অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। এখানকার কোন নিউজ পোর্টাল রোববারের পর আর আপডেট করা হয়নি, কারণ ইন্টারনেট বন্ধ। সংবাদপত্রের অফিসে কেউ নেই। কোনো পত্রিকা বেরুতে পারছে না। দিল্লি বা জম্মু থেকে প্রকাশিত কিছু সংবাদপত্র আসলেও তা পাওয়া যায়নি। কারণ, শ্রীনগরের মানুষ হাত করে নিয়েছে। তিন দিনের বাসি সংবাদ পড়ছে তারা। বলছেন, খবরগুলোতে সেন্সরের কাঁচি পড়েছে।

দুদিন পরেই কোরবানীর ঈদ। ভেড়ার পাল নিয়ে এসেছিলেন বহু ব্যবসায়ী। হতাশ তারা ভেড়ার পাল নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেড়া কেনার মতো কেউ নেই।

তারাই বলছেন, কেউ কিনবেই বা কেন! এরকম একটা পরিবেশে কে কোরবানি দেবেন, কার কাছে মাংস বিতরণ করবেন। কাশ্মীরের মানুষের ঈদের আনন্দ এবার মাটি, এক নিরানন্দ ঈদের অপেক্ষায় তারা।

ঈদের সময় হয়তো কাশ্মীরের কারফিউ শিথিল করা হতে পারে। কারো ধারণা ১৫ই আগষ্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের পর হয়তো কারফিউ উঠতে পারে। কিন্তু কাশ্মীর এখন যে ভয়-ভীতি-আতংকের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে, কোনো কিছুতেই কারো কোনো আশা নেই, কোনো ভরসা নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here