ধানে বিঘা প্রতি লোকসান সাড়ে ৩ হাজার টাকা

399

যশোর অঞ্চলের বোরো চাষিদের মুখে হাসি নেই। সরকার ধান ক্রয়ের আগে শূন্য হচ্ছে কৃষকের গোলা। দোকানদারি আর মহাজনের দেনা শোধ করতে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। বর্গা চাষিরা বিঘা প্রতি লোকসান দিচ্ছে পাঁচ হাজার ১৫০ টাকা। বেশি দামে শ্রমিক এনে ধান ঘরে তুলতে দ্বিগুণ খরচ হয়েছে তাদের। এ দিকে ধান চাষে লোকসানের পর ব্যাংক ঋণ, এনজিওর কিস্তি, মহাজন ও সার-কীটনাশক ব্যাবসায়ীদের দেনা শোধ করা দায় হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে, নিজস্ব জমিতে ধান চাষ করে লাভের মুখ চোখে দেখছে না কৃষকরা। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪২.৭ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। কৃষি থেকে জিডিপিতে ১৪.৭৯ ভাগ আয় যোগ হয়। কৃষিক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দ তুলনামূলক অনেক কম। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬.১০ ভাগ। এ বছর বরাদ্দ কমিয়ে ৫.৬৫ ভাগ করা হয়েছে। ফলে কৃষক ও কৃষিপণ্যের অবস্থা খুবই খারাপ। মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, চাতাল মালিক, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী ও দালালদের কারণে কৃষকরা সরকার ঘোষিত দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছে না।
যশোর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৬৩৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। আর উপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮ টন।

যশোর সদর উপজেলার দোগাছিয়ার কৃষক মহিউদ্দিন ও কৃষক আরাফাত হোসেন জানান, ৩৩ শতকে এক বিঘা জমিতে বোরো(বি-২৮) চাষ করতে এ বছর ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

বোরো মওসুমে এক বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ২২ মণ ধান ও সর্বনি¤œ ১৮ মণ ধান উৎপাদন হয়। ফলে গড়ে বিঘা প্রতি ২০ মণ ধান পায় কৃষক। বর্গচাষির প্রতিমণ ধান উৎপাদন খরচ ৯৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। আর জমির মালিকের ৭০৭ টাকা ৫০ পয়সা। বাজারে ধান বিক্রয় হচ্ছে ৭০০ টাকা মণ। এক মণ ধান উৎপাদন করার পর বিক্রয় করলে মণ প্রতি বর্গাচাষির ক্ষতি হচ্ছে ২৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। বর্গা কৃষকের এক বিঘা ধানে ৫ হাজার ১৫০ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। তবে ধানে ছাড়াও খড় বিক্রি করে প্রতি বিঘায় আরো আয় হয় এক হাজার ৬০০ টাকা। ফলে লোকসান কমে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৫৫০ টাকা। তবে সব সময় বিচালি বিক্রিযোগ্য থাকে না।
যশোরের কেশবপুরের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, এ বছর ধান চাষ করে বেশির ভাগ কৃষক দেনায় জড়িয়ে পড়েছে। ধান বিক্রি করে দায়দেনা শোধ করছে। পাশে থেকে আর এ কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, ধান কাটার সাথে সাথে বাড়িতে দেনাদারদের পদাচরণ বেড়ে যায়। ধান মাড়াই শেষ হতেই তারা টাকা জন্য চাপদেয়। ফলে উঠান থেকেই ধান বিক্রি করতে হয়। আর দোকানদারদেন হালখাতা আর মহাজনের দেন শোধ করতেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। অনেকের ঈদ হবে না বলে জানালেন শাহপুর গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুল গণি।

এদিকে সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে এক মণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় হওয়ার কথা থাকলেও যশোরের দোগাছিয়া, চুড়ামনকাটি, পুলেরহাট, রুপদিয়া, রাজগঞ্জ ধানের মোকাম খ্যাত বাজারে প্রতি মণ ধান রকম ভেদে ৬২০ টাকা থেকে ৭০০ পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে সরকারের এ দামের ব্যাপারে কিছুই জানে না কৃষক।

দোগাছিয়ার কৃষক মোশারফ হোসেন, মহিউদ্দিন, আকলাকুর রহমান বলেন, আমাদের দোগাছিয়া, চুড়ামনকাটি বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে কেউ ধান ক্রয় করছে না। সরকারে ধান ক্রয়ের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না।
কৃষকরা বলেন, সরকার যদি সরাসরি ধান ক্রয় করত তাহলে একজন কৃষক ১০৪০ টাকা মণ দরে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারত। এই নিয়মে একজন কৃষক ধান দিতে পারলে তিনি বাজার (বাজারে ৭০০ টাকা ধানের মণ) দর ছাড়া আরো ৩৪০ টাকা মণ প্রতি বেশি পেতেন। এতে কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হতো। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এ দাম পাচ্ছে না। সরকারি ধান কে বা কারা গুদামে সরবরাহ করেন তা সাধারণ কৃষকরা জানেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে ধান বিক্রির বাজার চলে গেছে।
কেশবপুরের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ধানের তেমন চাহিদা নেই। গত বছর ধান মজুদ করে লোকসান হয়েছে। মোকামে প্রচুর মজুদ থাকায় আগ্রহ নিয়ে কোনো মহাজন ধান ক্রয় করছে না।

যশোর খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় হওয়ার কথা। চিঠি আশার পরপরই ধান ক্রয় শুরু হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে যে দামেই বেচা-কেনা হোক না কেন এতে আমাদের কিছু করার নেই। তবে যশোরে জেলার সাবেক খাদ্য নিয়ন্ত্রক নকীব সাদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে এক সাথে চাল, ধান আর গম ক্রয় শুরু হয়েছে। ধান সাধারণ একটু দেরিতে ক্রয় করা হয়ে থাকে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গুদামে জায়গা সঙ্কট, দীর্ঘ সময় গুদামে রেখে দিতে হয় আর সহজে স্থানান্তর করা যায় না। তিনি বলেন, ধানের চেয়ে চাল ক্রয়ের দিকে আগ্রহ বেশি।
এ দিকে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে যশোরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

ভালো নেই চাতাল ব্যবসায়ীরা : যশোরের চৌগাছার চাতাল মালিকরা জানালেন, চলতি মওসুমে তাদের ব্যবসায় কোনো লাভ হচ্ছে না। চাতাল ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখতে তারা এ কাজ করছেন বলে জানিযেছেন। তাদের চাতালে এক কেজি বাঁশমতি চাল উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৩৭ টাকা আর বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে। ব্যবসায়ীরা জানান কুড়া আর খুদ বিক্রি করে আসল বাঁচাতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, সময়ের পরিক্রমায় চৌগাছা উপজেলাতে অসংখ্য চাতাল গড়ে উঠেছে। এ সব চাতালে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জানা গেছে, চৌগাছা পুড়াপাড়া বাজার ও সলুয়া এর আশপাশে ৯০টি চাতাল ছিল। এখন আছে মাত্র ৫৫টি। লোকসান হওয়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। গতকাল চাতাল ঘুরে এই সব তথ্য পাওয়া গেছে। সলুয়া বাজারের ভাই ভাই মিলের চাতাল মালিক নূর ইসলাম জানান, বর্তমানে এক মণ বাঁশমতি ধান কিনতে হচ্ছে থেকে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। ওই ধান চাতালে নিয়ে এসে সিদ্ধ শুকানো চাল তৈরিসহ নানাভাবে খরচ হয় মণ প্রতি ১০০০ টাকা। এক মণ ধানে ২৫ কেজি চাল ও আট কেজি কুড়া হয়। সে হিসাবে এক কেজি চালের উৎপাদন ব্যয় হচ্ছে ৩৭ টাকা। অথচ এই চাল তাদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৩৫-৩৬ টাকা কেজি দরে। প্রতি কেজিতে চাতাল মালিকদের লোকসান গুণতে হচ্ছে ১-২ টাকা। তবে ৮ কেজি কুড়া বিক্রি করে ৫০ টাকা আয় হয়। সে হিসাবে লোকসান না হলেও এ ব্যবসায় লাভ হচ্ছে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here