নগরে নালায় পড়ে মানুষ মরে, ঘুমে থাকে চসিক

73

 

দুর্ঘটনা। এসব উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করছে সেবা সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা)। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ তড়িঘড়ি শেষ করলেও পরবর্তীতে রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা দুর্ঘটনা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারাচ্ছে, আবার কেউ বরণ করছে পঙ্গুত্ব।

নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অন্ততঃ দেড় শতাধিক ড্রেন রয়েছে। যার ৯৫ শতাংশ অরক্ষিত। এছাড়া রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য খাল। এসব খালের পাশেও নেই কোনো সীমানা দেয়াল। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অসাবধানতাবশতঃ ড্রেন কিংবা খালে পড়ে মারা যাচ্ছে কেউ না কেউ। আহত হয়ে পঙ্গুত্বও বরণ করছে অনেকে। এসব অরক্ষিত ড্রেন কিংবা খাল নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথাও নেই সিডিএ বা চসিক’র। বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও দুই সেবা সংস্থার টনক নড়ছে না। ফলে নগরবাসীর কাছে এখন নতুন আতঙ্কের নাম ড্রেন কিংবা খাল।

অনুসন্ধান বলছে, গতবছর ঘটে দু’টি দুর্ঘটনা। চলতি বছরের শুরু থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অরক্ষিত ড্রেন ও খালে পড়ে মারা গেছে ৫ জন। আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছে একজন। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও আজও সে দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে।

চলতি বছর ড্রেনে প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ১৯ জুন। এদিন নগরীর চান্দগাঁওয়ে বৃষ্টির পানিতে সড়ক ডুবে গেলে সিএনজি অটোরিকশা চালক রাস্তার নিশানা বুঝতে না পেরে তিন যাত্রীসহ নালায় পড়ে যায়। এ ঘটনায় শফিক নামে এক যাত্রীর পা ভেঙে যায়। বাকিরা আহত হয়।
এ দুর্ঘটনার মাত্র ১১ দিনের মাথায় ৩০ জুন সকালে নগরীর ষোলশহর চশমা হিলে সড়কঘেঁষা অরক্ষিত খালে পড়ে সিএনজি অটোরিকশা তলিয়ে যায়। এ ঘটনায় চালকসহ এক বৃদ্ধা মারা যান। আহত হয় আরও দু’জন।

গত ২৫ আগস্ট (বুধবার) নগরীর মুরাদপুরে আয়োজন রেস্তোরাঁর সামনের নালায় অসতর্কতাবশতঃ পড়ে গিয়ে সালেহ আহমদ নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হন। একমাস খোঁজাখুজির পরও তার হদিশ পাওয়া যায়নি।

এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর (সোমবার) রাতে আগ্রাবাদের বাদামতলী এলাকায় নালায় পড়ে নিখোঁজ হন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া মেহবুব। নালার আবর্জনার স্তূপে আটকে থাকা অবস্থায় তার মরদেহ প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) আবারও কামাল (১৩) নামে এক শিশু নালায় পড়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার (৬ ডিসেম্বর) নগরীর শুলকবহর ওয়ার্ডের ষোলশহর চশমা খালের উন্মুক্ত নালায় খেলনা সাদৃশ্য বস্তু ভাসতে দেখে দুই বন্ধু কামাল ও রাকিব নালায় নেমে পড়ে। পরে রাকিব উঠে আসতে পারলেও, পানির স্রোতে কামাল ভেসে যায়। এখনও পর্যন্ত তাকে জীবিত কিংবা মৃত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নালা কিংবা খালে বারবার এসব ঘটনা ঘটছে চসিক এবং সিডিএ’র অবহেলায়। কিন্তু কোনো সংস্থা এসব দুর্ঘটনার দায় নেয়নি। আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তি কিংবা সংস্থা যদি কারও মৃত্যুর জন্য দায়ী হয়, সেক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারবার দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলেও এসব সংস্থার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কার্যতঃ কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি সংস্থাগুলো।

নিখোঁজ কামালের বাবা আলী কায়সার ছেলের একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘গত পরশু ছেলেকে নতুন ক্লাসে ভর্তি করাতে ছবি তুলেছি। আজ আমার ছেলের হদিশ নাই। আমার ছেলেকে জীবিত কিংবা মৃত আমার কোলে ফিরিয়ে দেন।’

এ ঘটনায় বেঁচে ফিরে আসা কামালের বন্ধু রাকিব বলে, গতকাল বিকালে নালায় একটা খেলনা ভাসতে দেখি। পরে আমি আর কামাল ওটা তুলতে পানিতে নামি। এসময় তীব্র স্রোতে দু’জনে ভেসে যাই। আমি দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে ময়লার সাথে আটকে কোনোরকম উঠে আসি। ওঠার পর কামালকে আর দেখতে পাইনি।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে আছি। আমাদের টিম ওই শিশুকে খোঁজাখুঁজি করছে। কিন্তু তাকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটি ডুবুরি দলও কাজ করছে।’ শিশুটিকে না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

দুর্ঘটনার দায় নিয়ে রশি টানাটানি :

এমন অবহেলাজনিত কারণে কারো মৃত্যৃ হলে সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। সমস্যার সমাধান হয় না। বরং দুই সংস্থার দায় চাপাচাপির উত্তাপে ড্রেন ও খালে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বর্তমানে নগরীর অরক্ষিত নালা-খালগুলো যেন এক একটা মরণফাঁদ।

মান্ধাতার আমলে নির্মিত এসব ড্রেনের সংস্কার শেষ হলেও সবক’টি ড্রেনের ওপরে স্ল্যাব কিংবা নিরাপত্তা বেষ্টনি দিতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। বিষয়টি বারবার গণমাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এ ব্যাপারে কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটছেই।

জানা যায়, নগরীর যেসব নালা কিংবা খাল তিন ফুটের (গভীরতা ও প্রস্থে) বেশি- সেগুলো চসিক দেখভাল করে না। এসব খাল-নালা দেখভালের দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। তবে সিডিএ বলছে, নালা দেখাশোনা, বেস্টনি দেওয়া সিডিএ’র কাজ নয়। এসব দেখভাল করবে চসিক। এখন জনমনে প্রশ্ন- আসলে নগরীর ড্রেন কিংবা খালের মালিক কে!

এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম. রেজাউল করিম চৌধুরী। এসময় তিনি কামালের বন্ধু রাকিবকে বলেন, ‘সাঁতার না জানলে পানিতে নামছো কেন!’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here