নাহার এগ্রোতে বানিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে ড্রাগন ফল

প্রকাশিত: ৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

কয়েক বছর পূর্বেও ড্রাগন ফল সম্পর্কে ধারনা ছিলো না মানুষের। প্রথমে কেউ কেউ শখের বসে এই ফলের চাষ করেন। এখন মিরসরাইয়ে অনেকটা বানিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের সর্বাধুনিক ও বহুমুখী গুণে গুণান্বিত পুষ্টিকর ফলের রাজা ‘ড্রাগন’ ফল। ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম হাইড্রোসেনাস এন্টেটাস।
জানা গেছে, পাতাবিহীন এই গাছটি ক্যাকটাসের মত দেখতে। এই গাছটিকে অনেকে ক্যাকটাস মনে করে। বাংলাদেশের আবহাওয়া জলবায়ু ড্রাগন ফল চাষের অনুকূল হওয়ায় বর্তমানে অনেকে শখের বসে ও বানিজ্যিকভাবে এই ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছে। অল্প জায়গায় স্বল্প খরচেই চাষ করা যায় ড্রাগন। সুস্বাদু এ ফলটি বিক্রি করেও বেশ ভালোই লাভ হয়। মিরসরাইয়েও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে ড্রাগন ফলের চাষ। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই ড্রাগন চাষের সুবিধায় দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে স্থানীয়রা।
সূত্র জানায়, মিরসরাইয়ে নাহার এগ্রো গ্রপের বিভিন্ন প্রজেক্টে গত এক দশক ধরে ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে। এখানে প্রথমে নিজেদের খাওয়ার জন্য ছোট পরিসরে চাষ করলেও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ করছেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানের জিএম (প্রোডাকশন) আতিকুর রহমান। তিনি জানান, নাহার এগ্রো গ্রæপের পশ্চিম অলিনগর, সোনাপাহাড়, করেরহাট, কুমিরা ও ফটিকছড়ি প্রকল্পে ড্রাগন ফলের বাগান রয়েছে।
জানা গেছে, অনেকটা শখের বশে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছিলেন নাহার এগ্রো গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান টুটুল। শতভাগ সফলও হয়েছেন। এখন বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফল আবাদ করছেন তিনি। রাকিবুর রহমান টুটুল পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ড সফরকালে এই ড্রাগন ফলটির চাষাবাদ ও পুষ্টিগুণ দেখে বাংলাদেশের আবহাওয়ায়ও চাষাবাদ সম্ভব জেনে কয়েকটি কাটিং নিয়ে আসেন। এর পর মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকার নাহার এগ্রো হ্যাচারির পতিত জমিতে চাষ শুরু করেন। এরপর পশ্চিম অলিনগর, সোনাপাহাড়, করেরহাট, কুমিরা ও ফটিকছড়ি প্রকল্পে চাষ করা হয়েছে। প্রতিবছর একটু একটু করে বেড়েছে বাগান। বর্তমানে তার ড্রাগনের বাগানের পরিমাণ প্রায় চার একর। বাগান বড় হওয়ার সাথে সাথে বড় হচ্ছে গাছ। তাতে প্রতিবছর বাড়ছে ফলনও। এবছর প্রায় ৩০ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেছে নাহার এগ্রো
এই বিষয়ে ড্রাগন ফল চাষের উদ্যোক্তা রাকিবুর রহমান টুটুল বলেন, এক যুগ আগেই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন আমাদের দেশে বিদেশি ফল ড্রাগনের চাহিদা রয়েছে। সুপারশপগুলি চড়া দামে এসব ফল বিক্রি করতো। যেহেতু বিদেশ থেকে আমদানি করা হত, তাই ফলগুলো তাজা থাকতো না। তাছাড়া তাজা রাখার জন্য কেমিক্যাল ব্যবহার করার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। দেশের মানুষকে তাজা এবং কেমিক্যালমুক্ত ড্রাগন খাওয়াতে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০৯ সালে প্রথমে তিনি থাইল্যান্ড থেকে দুইটি চারা এনে মিরসরাইয়ে নাহার ডেইরি ফার্মের পুকুর পাড়ে লাগান। ওই গাছ দুইটি বড় হলে সেখান থেকে শাখা কাটিং করে ধীরে ধীরে বাগান বড় করেন। বর্তমানে মিরসরাইয়ের জোড়ারগঞ্জ, করেরহাট, অলি নগর এবং ফটিকছড়ির নানুপুরে তার ড্রাগনের বাগান রয়েছে। একেকটি গাছ থেকে এক মৌসুমে প্রায় পাঁচ কেজি ড্রাগন পাওয়া যায় উল্লেখ করে বলেন, গত বছর তিনি সাত টন ড্রাগন ফল বিক্রি করেছিলেন। এবছর বিক্রি করেছেন ১১ টন। কেজি ২৫০ টাকা করে তার ফলগুলো বিক্রি হয়েছে। তার বাগানে উৎপাদিত ফল হালকা মিষ্টি। যা আমদানি করা ফলের চেয়ে অনেক ভাল। বাজারে তিন ধরনের ড্রাগন ফল আছে উল্লেখ করে বলেন, তার বাগানে পিংক কালারের ফল রয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে হলুদ রঙের বাগানও করেছেন। আগামী বছর থেকে হলুদ রঙের ড্রাগন ফলও বাজারজাত করার আশা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশের আবহাওয়া ড্রাগন চাষের উপযোগী। বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষ করে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। তিনি নিজেও ড্রাগন চাষ করে লাভবান হয়েছেন। তবে একটু উচুঁ জায়গায় রোপন করতে হয়। গাছের প্রচুর পরিমাণে পানি দিতে হয়।
সেখান থেকে কাটিং করে চলতি বছর ড্রাগন ফল বিক্রি করেছেন প্রায় ১১ টন। বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন উৎপাদন করে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ড্রাগন বিক্রি করা হয়েছে।
নাহার এগ্রো গ্রæপের জিএম (প্রোডাকশন) মনোজ কুমার চৌহান বলেন, আমাদের ড্রাগন বাগান পরিচর্চার জন্য কৃষি অফিসার সহযোগীতা করেন। তারা মাঝে মাঝে বাগান পরিদর্শন করেন। আমাদের একটা স্পেশাল টিম রয়েছে যারা ড্রাগনের জন্য কাজ করে থাকে। এমন সফলতায় অনুপ্রাণিত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী বিশ্বব্যপী এই ফল জনপ্রিয়তা হওয়ার অন্যতম কারণ পুষ্টি গুনাগুন।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জানান, ড্রাগন ফলের পুষ্টি গুনাগুন অনেক। আমাদের দেশে ধীরে ধীরে এই ফলের চাষ বড়ছে। সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে-দোআঁশ মাটিই ড্রাগন চাষের জন্য উত্তম। তবে এর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে যতœ নিতে হবে। তিনি আরো জানান, ড্রাগন ফলের চাষ সম্পর্কে আমরা মানুষকে উদ্ধর্ধ করছি।