প্রসঙ্গ :বিদেশে পড়া লেখা এবং নাগরিকত্ব

438

প্রসঙ্গ :বিদেশে পড়া লেখা এবং নাগরিকত্ব

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জন ইংল্যান্ড এ পড়তে আসার ব্যাপারে আমার কাছ থেকে পরামর্শ চেয়েছে। বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশে সেটল হওয়ার ব্যাপারেও পরামর্শ চেয়েছে। এই ব্যাপারে অন্যদেরও আগ্রহ থাকতে পারে, তাদের উদ্দেশ্যে এই লেখা। এখানে আমি আমার মতামত দিয়েছি, যা অন্য কেউ সমর্থন করতে পারে আবার নাও করতে পারে।
১। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ালেখা করার জন্য বিদেশে গেলে এমন কোথাও যাওয়া উচিত যেখানে পড়ালেখা শেষ করে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সুযোগ আছে। ওই দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর যেখানে ভাল লাগে সেখানে যাওয়া যাবে বা নিজ দেশে ফিরে যাওয়া যাবে, কেউ মানা করবে না। পড়ালেখা করা অবস্থায় কয়েক বছর সময় পাওয়া যাবে ওই দেশের পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, নিজের নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করতে। যেটা পরে স্থায়ীভাবে বসবাসের সময় কাজে দিবে। ব্যাচেলর্স চার বছর, মাস্টার্স দুই বছর, পিএইচডি তিন থেকে পাঁচ বছর। যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খেয়ে নেয়ার জন্য এবং নিজের নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করার জন্য।


২।যেসব দেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সুযোগ আছে তার সবগুলোই পশ্চিমা দেশ। কোন মুসলিম প্রধান দেশে এই সুযোগ নেই । বাংলাদেশে কারো কারো মধ্যে অদ্ভুত একটি ধারণা আছে যে পশ্চিমা দেশে একজন মুসলিমের তার ধর্মীয় কার্যক্রম যথাযথ ভাবে করার সুযোগ নেই। পশ্চিমা দেশে না গিয়ে না থেকে নিজের কনফাইনমেন্টের মধ্যে থেকে লোকমুখে শোনা কথার উপর ভিত্তি করে মন্তব্য করা ব্যক্তির উপর নির্ভর করা, এবং প্রচলিত চিন্তাধারার বাহিরে ও কৌশলগত চিন্তা করার অক্ষমতার কারণেই হয়ত এমন ধারণার জন্ম।


আমার নিজের লন্ডনে প্রায় ৬ বছর থাকার অভিজ্ঞতা হচ্ছে সেখানে ইসলামিক জীবনধারণের কোন রকম প্রতিবন্ধকতা আছে বলে আমার মনে হয়নি। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকতে পারে যা বর্তমানে মুসলিম প্রধান দেশেও থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম প্রধান দেশে প্রতিবন্ধকতা বরং বেশি আছে। দাঁড়ি না রাখতে বলা, হিজাব না পড়তে বলার মত ঘটনা বর্তমানে বাংলাদেশে ঘটছে।
সত্যি যে পশ্চিমা দেশে থাকলে সবচেয়ে কাছের মসজিদ হয়ত বাসার ঠিক পাশে নাও থাকতে পারে। দশ-পনের-বিশ মিনিট হয়ত হাঁটতে হতে পারে। যার মসজিদে নামাজ পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ আছে তার নিশ্চয় অতটুকু হাঁটার ব্যাপারে আপত্তি থাকার কথা না। বরং খুশি হওয়ার কথা যে প্রতিটি পদক্ষেপ মানেই বাড়তি নেকি। আমি ইংল্যান্ডের একজনের আলোচনা শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন যে তিনি ইচ্ছা করেই মসজিদ থেকে একটু দূরে গাড়ি পার্ক করেন যেন একটু বেশি স্টেপস দিয়ে বাড়তি নেকি তিনি অর্জন করতে পারেন। সেসব দেশে গাড়ি কেনা যেহেতু কঠিন কোন ব্যাপার না, মসজিদ যদি দূরেও হয়, ইচ্ছা থাকলে গাড়ি চালিয়ে যাওয়াও কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছে প্রতিবন্ধকতাই হচ্ছে ভাল কিছু করার সম্ভাবনা।নিজের ধর্মীয় ব্যাপার সঠিক ভাবে পালন করা মূলত নিজের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।


আমি ২০১৩ সালে ইংল্যান্ড এর সামারসেট এ গিয়েছিলাম তিন দিনের জন্য। রমাদানের সময় ছিল। একটা মসজিদে আমরা ইফতার করলাম যেখানে এক এক দিন এক এক জন (বা কয়েকজনের এক একটা গ্রুপ) ফ্রি ইফতারের আয়োজন করে।মিডিয়া মূলত নেতিবাচক দিকগুলোই বারবার হাইলাইট করে, যার কারণেও অনেক ভুল ধারণার জন্ম হয়।
৩।পশ্চিমা দেশের নাগরিকত্ব নিলে সে দেশের অনুগত থাকার শপথ করতে হয়, এটা নিয়েও কারো কারো আপত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে কোন দেশের নাগরিকই নিজ নিজ দেশের নিয়ম-কানুন এবং সরকারি নির্দেশের অনুগত থাকতে বাধ্য। মুসলিম প্রধান দেশ হলেই যে তা মুসলিমদের স্বপক্ষে কাজ করবে এমন ধারণা যে খুবই ভুল তার একাধিক বড় ধরণের উদাহরণ বর্তমানে বিদ্যমান। মুসলিম প্রধান দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়ানোর ঘটনা অতীতেও আছে, বর্তমানেও আছে। সেন্সিটিভিটির কারণে উদাহরণ দেয়া থেকে বিরত থাকলাম ।
পশ্চিমা দেশে বসবাসের বিপক্ষে আরেকটি যুক্তি দেয় যে ওই সব দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াচ্ছে এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে সে যুদ্ধের অর্থায়ন হচ্ছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা দেশের মুসলিমরা স্বাধীনভাবে যে পরিমাণ প্রতিবাদ করছে সে সুযোগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও সম্ভব হচ্ছে না। তারা ট্যাক্স দেয় বলেই এবং পশ্চিমা দেশের নাগরিক বলেই তাদের প্রতিবাদকে সর্ব মহলে গুরুত্ব দেয়া হয়, যা অন্যান্য দেশে হলে হত গুরুত্বহীন। নিজ (পশ্চিমা) দেশের রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের বিষয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার ঘটনা পশ্চিমা দেশেই আছে। এছাড়া সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো থেকে দেখা গেছে পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধে জড়াচ্ছে একাধিক মুসলিম প্রধান দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য বা সমর্থন নিয়েই। একই দোষে সবাই কমবেশি দোষী। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে এই বিষয় ভালই বুঝতে পারার কথা। আবার পশ্চিমা সব দেশ যে যুদ্ধে জড়াচ্ছে তাও না; অনেক দেশের ভূমিকা সত্যিকার অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত দেশের পুনর্গঠন বা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
৪। পশ্চিমা দেশে থাকার বিরুদ্ধে আরেকটি বিষয় সামনে আনা হয় – “ফিতনা”! এর মাধ্যমে তারা মূলত বুঝতে চায় নারী সংক্রান্ত বিষয়! যারা মধ্যপ্রাচ্যে এ আছেন তারা জানেন যে পশ্চিমা দেশকে আলাদাভাবে এই ক্ষেত্রে দোষারোপ করা অন্যায়। এছাড়া বর্তমান সময়ে অনেক কিছুই এতটা সহজলভ্য যে কে কোন দেশে আছে ম্যাটার না। কে কি করবে, কোন দিকে তাকাবে বা কিভাবে বিহেভ করবে তা নিজের উপরই নির্ভর করে মূলত।
এছাড়া পশ্চিমা দেশের মানুষের সাথে ডিল করে আমার যে অভিজ্ঞতা, সেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে রেস্পেক্টবল সম্পর্ক বিদ্যমান। নারী দেখা মানেই তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে হবে বা তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে, এমন প্রাকটিস আছে বলে আমার মনে হয় নাই। বৈবাহিক সম্পর্কে পারস্পরিক বিশ্বাস সে সব দেশে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয় বলে মনে হয়েছে। অনৈতিক কিছু করার চেষ্টা করা মানে সেক্সচুয়াল হার্রাসমেন্টের অভিযোগ উঠতে পারে, যা ক্যারিয়ারের বারোটা বাজাতে পারে। বাস্তবতা এবং সিনেমার মধ্যে গুলিয়ে না ফেলাটাই উত্তম।
৫ । সত্যি যে বিদেশে একেক জনের পারিপার্শ্বিক অবস্থা একেক রকম হতে পারে। তার উপর ভিত্তি করে অভিজ্ঞতা একেক রকম হতে পারে। যেমন গতকাল একজনের লেখা পড়ছিলাম, দুই বছর মধ্যপ্রাচ্যে থেকে তার ধারণা হয়েছে ওই সব দেশের লোকজন খুবই খারাপ। আবার একাধিক লোক বলছেন, তাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের লোকজন অনেক দানশীল। ইংল্যান্ডে ছয় বছর আমার থাকার অভিজ্ঞতা খুবই ভাল, কিন্তু আবার আমি একজনকে জানি যিনি সাত বছর ইংল্যান্ডে থেকে সে দেশ সম্পর্কে তার ধারণা খারাপ। তাকে অবশ্য জিজ্ঞেস করা হয় নাই যে ওই দেশ যদি এতই খারাপ হয় তো তিনি সাত বছর ওখানে কি করছিলেন!

লেখকঃ
মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী
বি,এস, সি (অনার্স‌) কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইউ,এস,টি ,সি,বাংলাদেশ)
এম ,এস,সি ইনফর্মেশন টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট (লন্ডন,ইউনাইটেড কিংডম)
Lecturer(ICT)
Institute of Health technology,Chottogram
E-mail:mozammal_ustc@yhaoo.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here