রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রনে ডা. মাহবুবর রহমানের কিছু পরামর্শ

288

শরীরের চর্বি বা কোলেস্টেরল নিয়ে নানা ধরণের ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে আছে। এমনকি ডাক্তারদের মধ্যেও এটা আছে। বিশেষ করে মেডিসিনে যাঁরা প্র্যাকটিস করেন তাঁদের অনেকের মধ্যেও একটি বদ্ধমূল ভুল ধারণা আছে। ধারণাটি হল-যতদিন কোলেস্টেরল বেশি পাওয়া যাবে ততদিন ওষুধ খেতে হবে। ব্যাপারটা একটু পরিস্কার করে বলা দরকার।

শরীর গঠনে অন্যান্য উপাদানের মত চর্বি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোটি কোটি দেহকোষের প্রাচীর, বহুসংখ্যক হরমোনসহ অসংখ্য শরীরবৃত্তীয় ক্রিয়া বিক্রিয়ার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হল কোলেস্টেরল। প্রাণীর মস্তিস্কের প্রায় পুরোটাই কোলেস্টেরল দিয়ে তৈরি। তাহলে কোলেস্টেরল খারাপ হবে কেন?

বিষয়টি খারাপের বা ভালোর নয়। প্রতিটি জিনিসেরই একটি মাত্রা থাকে। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই সমস্যা দেখা দেয়। আমাদের কোলেস্টেরল মাত্রা জানতে হলে অন্তত ১০ ঘন্টা খালি পেটে একটি লিপিড প্রোফাইল করা দরকার। লিপিড প্রোফাইলে total cholesterols, high density lipoprotein- HDL, low density lipoprotein-LDL, এবং Triglycerides এর বিস্তৃত বিবরণ থাকে।

এই চারটি উপাদানের আনুপাতিক উপস্থিতি পরবর্তী চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেকে শুধু total cholesterols এবং triglycerides পরীক্ষা করার উপদেশ দিয়ে থাকেন। তাতে করে HDL এবং LDL এর পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে বুঝা সম্ভব হয় না। সুতরাং সকলের উচিত বয়স ৩০ হলে অথবা পরিবার বা বংশে যদি অল্প বয়সে কেউ হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তাহলে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করা।
ভাল বনাম খারাপ কোলেস্টেরল:

রক্তনালীর দেয়ালে জীবন্ত কোষের অবিরাম ভাঙাগড়া চলতে থাকে। সুস্থ মানুষের এই ভাঙাগড়ার মধ্যে একটি পারফেক্ট ব্যালেন্স থাকে। কিন্তু যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল আছে , যারা ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করেন, স্থূল শরীর ব্যায়ামহীন কাটান তাদের রক্তনালীর জীবন্ত কোষের ভাঙা গড়ার প্রক্রিয়াটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।

কোষের এই ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়ায় HDL কোলেস্টেরল রক্তনালী রক্ষায় পজিটিভ ভূমিকা পালন করে। এজন্য একে গুড কোলেস্টেরল বলা হয়ে থাকে। আর LDL কোলেস্টেরল বিশেষ করে পরিবর্তিত oxidized LDL রক্তনালীর দেয়ালে একধরণের প্রদাহ সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে এই প্রদাহের ফলে রক্তনালীর গাত্রে চর্বির দলা (plaque) গড়ে উঠে রক্তনালীকে সরু করে রক্তের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে।

সাধারণ মানুষ এটাকে ব্লক বলে থাকেন। কোন ব্লক যখন রক্তনালীর কমপক্ষে ৭০% ভাগ লুমেন সরু করে দেয় তখন অল্প পরিশ্রমে বুকে ব্যথা, চাপ, শ্বাসকষ্ট বা ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়। চিকিৎসার ভাষায় এটাকে বলে এ্যানজাইনা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, হার্ট ব্লক বা ব্রেন স্ট্রোক সৃষ্টিতে কোলেস্টেরলের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। যার যত গুড কোলেস্টেরল (HDL) বেশি থাকবে এবং মন্দ কোলেস্টেরল (LDL) কম থাকবে সে তত নিরাপদ থাকবে।

কেন এই ভারসাম্যহীন কোলেস্টেরল?
আমরা যখন রোগীকে বলি যে, গরু খাসীর মাংস এড়িয়ে চলুন, তখন অনেক রোগী প্রশ্ন করেন, “কেন স্যার, গরু তো নিজে ঘাস খায়, তাহলে তার মাংসে এত চর্বি কিভাবে হয়?”

কথা সত্য। গরু ঘাস খায়। তবে গরুর শারীরিক গঠন ভিন্ন, তার ফিজিওলজি ভিন্ন। আর শরীরের চর্বি তৈরীর কারখানা হল লিভার। যার লিভার চর্বি তৈরীর জন্য যত মুখিয়ে থাকে সে যতই শাকসবজি ঘাস খাক না কেন লিভার তার কাজ চালিয়ে যাবেই।

এটা হয় যখন শরীরের মেটাবলিজম পাল্টে যায়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি, অ্যালকোহল পান, বাড়তি ওজন, হাঁটাচলা না করা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো উপস্থিত থাকে। এসব কারণে লিভারের কোষে রিসেপ্টর সমস্যা দেখা দেয়। ফলে অতিরিক্ত মন্দ কোলেস্টেরল রক্তে ভাসতে থাকে। এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বিশেষ করে হার্ট ও ব্রেণের রক্তনালীর দেয়ালে চর্বির দলা জমে জমে ব্লক তৈরি করতে থাকে।

প্রতিরোধের উপায় কি?
প্রথমত যেসব কারণে কোলেস্টেরল মেটাবলিজম ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে সেগুলোর প্রতিকার করতে হবে। ডায়াবেটিসকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের উপযুক্ত চিকিৎসা করতে হবে। ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে। ওজন কমাতে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজনে চর্বি কমাতে নিয়মিত statin জাতীয় ওষুধ খেতে হবে। ডায়াবেটিস যাদের আছে তাদের বয়স ৪০ হলে সারাজীবনের মত statin খেতে হবে। ডায়াবেটিসের ওষুধ যেমন সারাজীবন খেতে হয় তেমনি চর্বির ওষুধও সারাজীবন খেতে হবে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছাড়া statin কখনো বন্ধ করা যাবে না। অনেক ডাক্তারকে দেখা যায় চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এটা একটি ভুল ধারণা এবং অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করলে রক্তের সুগার যেমন বেড়ে যায়, তেমনি কোলেস্টেরলের ওষুধ বন্ধ করলে তা বাড়বেই।

লক্ষ্যমাত্রা কত?

গুড কোলেস্টেরল (HDL) পুরুষের ক্ষেত্রে ৪০ মিলিগ্রামের উপরে এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৫০ মিলিগ্রামের উপরে থাকতে হবে। মন্দ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা সুস্থ মানুষের জন্য ১৩০ থেকে ১৬০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকতে হবে। তবে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ক্ষেত্রে ১০০-এর মধ্যে রাখা নিরাপদ। আর যাদের ইতিমধ্যে হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে বা ব্রেন স্ট্রোক অথবা পায়ের রক্তনালীতে ব্লক ধরা পড়েছে তাদের ক্ষেত্রে LDL এর মাত্রা ৭০ মিলিগ্রামের নিচে রাখতে হবে। Triglycerides এর মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম নীচে রাখলে ভাল।

কি খাবেন?
প্রচুর তাজা শাক সবজি, ফলমূল, উদ্ভিজ প্রোটিন বেশি করে খাবেন। পর্যাপ্ত মাছ খাবেন, সামুদ্রিক মাছ হলে আরো ভাল। মাংস খেতে চাইলে সপ্তাহে দু’দিন মুরগীর মাংস খেতে পারেন, তবে চামড়া, গিলা, কলিজা এসব ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাদ দিয়ে খাবেন। দিনের দু’বেলা ব্রাউন রুটি এবং দুপুরে একবেলা পরিমিত পরিমাণে (সম্ভব হলে ঢেঁকিছাটা চালের) ভাত খাবেন।

কি খাবেন না?
শরীরের মোট চর্বির প্রায় ৮০ শতাংশ তৈরী বা নিয়ন্ত্রণ করে লিভার। বাকী মাত্র ২০ শতাংশ আসে খাদ্য থেকে। তাই চর্বি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য উপাদানের প্রভাব তুলনামূলক কম। তা সত্ত্বেও প্রাণীজ লাল মাংস যেমন: গরু ,খাসী, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ, উট, হাঁস এবং ঘি, মাখন, সরযুক্ত ঘন দুধ, চিংড়ি, পোলাও, বিরিয়ানি, যেকোনো তেলে কড়কড়ে ভাজা খাদ্য ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উত্তম। এছাড়া যেকোন প্রাণীর শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না খাওয়া উচিত। তবে শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল ও পর্যাপ্ত আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি যোগান দিতে প্রতিদিন একটি কুসুমসহ ডিম ও পাতলা সরমুক্ত এক কাপ দুধ পান করা স্বাস্থ্যকর।

লেখক: ডা. মাহবুবর রহমান

সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল
সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here