চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লুটপাটে ধসে পড়ছে ব্যাংক খাত। আব্দুল হাই বাচ্চু ও মহীউদ্দীন খান আলমগীরের অনিয়ম-দুর্নীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক খাদের কিনারে। অন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতেও জড়িয়ে আছেন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ব্যাংক খাতে অনিয়মের আরেকটি বড় জায়গা হলো, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে মিলেমিশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা।
এ সুযোগ আর থাকছে না। এ ধরনের পরিচালকদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক, একই সঙ্গে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা জরিমানা, ৩ বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন তারা। কেবল পরিচালকরাই নয়, অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই বিধান কার্যকর হবে।
বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ সংশোধন করে নতুন এমন ধারা সংযোজন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। খসড়ায় ৫০টিরও বেশি ধারা-উপধারা সংযোজন, পরিমার্জন ও সংশোধন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ সিদ্দিকুর রহমান। আগামী ২১ দিন এই খসড়ার ওপর মতামত সংগ্রহ করে তা চূড়ান্ত করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
খসড়া আইনের ৪৬ (ঘ) ধারা নতুন সংযোজন করে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ কোনো ঋণ জাল-জালিয়াতি বা গুরুতর অনিয়মের মাধ্যমে অনুমোদন করলে বা অনুমোদিত ঋণ পরে বেনামি বা অস্তিত্বহীন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে দেওয়া হয়েছে
প্রমাণিত হলে বা ঋণের সুবিধাভোগী বাদে অন্য কারও কাছে ঋণের অর্থ স্থানান্তর হলে বা নিজ ব্যাংকের পরিচালকের বেনামি ঋণ হিসেবে তদন্তে প্রমাণিত হলে ওই ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সকল কর্মকর্তা ও পরিচালকরা প্রত্যেকে দোষী বলে গণ্য হবেন। তাদের পদ থেকে অপসারণ করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ ধারায় আরও বলা হয়েছে, অপসারিত ব্যক্তিরা ফৌজদারি অপরাধে দায়ী হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট হওয়ার সময় থেকে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের হিসাব অবরুদ্ধ ও সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।
আইনের এ ধারায় আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে যেকোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক বা এমডি বা সিইও তার নিম্নতর দুই স্তর পর্যন্ত কর্মকর্তাকে অপসারণ করতে পারবে।
খেলাপি গ্রাহককে ঋণ দিলে ওই ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিচালক ও কর্মকর্তাদের তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে খসড়া আইনে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতার নামে কোনো ঋণসুবিধা দিয়েছে প্রমাণিত হয়, তাহলে সাথে সাথে তা বাতিল হবে এবং তার কাছে প্রাপ্য পুরো অর্থ ফেরতযোগ্য হবে। ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে কোম্পানি আদালতে মামলা করতে পারবে। খেলাপি গ্রাহককে নতুন করে ঋণ দিলে ওই ঋণ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত সকল পরিচালক ও কর্মকর্তাকে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা ৩ বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ গত রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ক্ষমতা এতদিন ধরে আছে, তারও সঠিক প্রয়োগ নেই। তার মধ্যে ক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এখন সবচেয়ে দরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতার প্রয়োগ করা। আশা করি তারা সেটা করবে।
এতদিন ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ নিতে ব্যক্তিগত গ্যারান্টির কোনো শর্ত ছিল না। খসড়া আইনে এ শর্ত যুক্ত করে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত গ্যারান্টি ছাড়া বিনা জামানতে কোনো পরিচালকের পরিবারের সদস্যকে ঋণ দেওয়া যাবে না।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করতে দুটি কমিটি কাজ করবে। আর ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ছবিসহ নামের তালিকা ব্যাংকগুলো নিজেদের ওয়েবসাইটে ও সংবাদপত্রে প্রকাশ করবে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের নামে কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারবে ব্যাংক। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিজনেস ক্লাসে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু, নতুন কোম্পানি নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে।
তবে গত মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের খসড়ায় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে তাদের বিদেশযাত্রার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। শুধু তারা বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করতে পারবেন না বলে উল্লেখ আছে।
এ প্রসঙ্গে ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকাটাই যৌক্তিক। তারা বিজনেস ক্লাসে গেল, নাকি ইকোনমি ক্লাসে গেল সেটা বিষয় নয়। চীন ঋণখেলাপিদের বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আমাদের দেশেও তাই হওয়া উচিত।
দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বড় অংশই বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক। আইনি নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন না। ফলে পরিচালকরা অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে নিজেরা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এসব ঋণের বড় অংশই খেলাপি হলেও তা আদায় করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
এ পরিচালকরা ঋণ নিয়ে খেলাপি হলেও তাদের ঋণখেলাপির তথ্য অন্য খেলাপি গ্রাহকদের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো-সিআইবিতে থাকে না। ফলে খেলাপি হয়েও নতুন করে ঋণ পেতে কোনো অসুবিধা হয় না ব্যাংক পরিচালকদের।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা-১৭ অনুযায়ী এদের



