চট্টগ্রামে রেলের বাসা নিয়ে ‘মধুর বাণিজ্য’

399

 

নিউজ ডেস্ক..

চট্টগ্রামের আমবাগান এলাকায় ঢুকতেই চোখে পড়ে আমবাগান মসজিদ। মসজিদের সামনের রাস্তার ঠিক বিপরীতে পাকা দেয়ালে ঘেরা লাল রঙের রেলওয়ে কোয়ার্টার। চারদিক টিনের ঝুপড়িঘর ও দোকানে ঘেরা কোয়ার্টারটি। ঘরগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, রাস্তা থেকে উঁকি দিলে কেবল কোয়ার্টারের ওপরের অংশই চোখে পড়বে। লোহার দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখা যায় কোয়ার্টারের দেয়ালের পাশে শুধু চলাচলের জন্য সামান্য জায়গা রেখে ২৫ থেকে ৩০টি কক্ষ। রাস্তার দিকে রয়েছে একাধিক দোকান। রান্নার জন্য বাইরে রাখা হয়েছে গ্যাসের চুলা। রয়েছে বাথরুমও। ভাড়াটিয়ারা জানালেন, কোয়ার্টারটি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা (আদালত পরিদর্শক, গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিন সরজুর। তবে তিনি সেখানে থাকেন না। কোয়ার্টারসহ ঘর ও দোকানগুলো তিনি ভাড়া দিয়েছেন। জিনিয়ার হয়ে এসব দেখভাল করেন লিটন নামে এক ব্যক্তি।

শুধু জিনিয়া নাসরিনই নন, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই বাসা বরাদ্দ নিয়ে এভাবে ‘মধুর বাণিজ্য’ করছেন। তারা পুরো বাসা ভাড়াই দেননি, অনেকেই কোয়ার্টারের আঙিনা ও আশপাশের খালি জায়গায় নির্মাণ করেছেন কাঁচা-পাকা অনেক ঘর। এসব ঘর ভাড়া দিয়ে ‘উপরি আয়’ করছেন। এমন আয়ের সুযোগ থাকায় রেলওয়ের বাসার চাহিদাও বেশি। তাই বরাদ্দ এবং পছন্দের বাসাটি পেতে ঘাটে ঘাটে দিতে হয় অর্থ। অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া এসব বাসায় থাকা পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও অবৈধভাবে দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন চট্টগ্রামের ৩০টি কলোনিতে চার ক্যাটাগরিতে মোট পাঁচ হাজার ৩২৯টি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য ১৫৩টি। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য ২৩৭টি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য দুই হাজার ২৫৫টি এবং চতুর্থ শ্রেণির জন্য দুই হাজার ৬৮৪টি বাসা রয়েছে।

চট্টগ্রামে রেলওয়ের অধীনে থাকা কলোনিগুলো হলো- স্টেশন কলোনি, স্টেশন রোড এলাকা কলোনি, পলোগ্রাউন্ড কলোনি, হাসপাতাল কলোনি, সিআরবি অফিসার্স কলোনি, টাইগারপাস কলোনি, ফ্লোরাপাস কলোনি, বয়নিউ কলোনি, লালখান বাজার কলোনি, পাহাড়তলী নিউ ঝাউতলা কলোনি, পাহাড়তলী ঝাউতলা কলোনি, পাহাড়তলী টিপিপি কলোনি, পাহাড়তলী ডিজেল কলোনি, পাহাড়তলী উত্তর আমবাগান কলোনি, পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনি, পাহাড়তলী দক্ষিণ আমবাগান কলোনি, পাহাড়তলী সেগুনবাগান ও রেঞ্জ রোড কলোনি, পাহাড়তলী এক্স-ই জন কলোনি, পাহাড়তলী ফিল্টার বেড কলোনি, পাহাড়তলী মাস্টার লেন কলোনি, পাহাড়তলী শহীদ লেন কলোনি, পাহাড়তলী নিউ শহীদ লেন কলোনি, পাহাড়তলী ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভেলুয়ার দীঘিরপাড় কলোনি, পাহাড়তলী সিগন্যাল কলোনি, পাহাড়তলী পাওয়ার হাউস ও বাজার কলোনি, পাহাড়তলী স্টেশন কলোনি, পাহাড়তলী লোকো কলোনি, পাহাড়তলী হাসপাতাল কলোনি, ফ্রান্সিস রোড কলোনি এবং ইঞ্জিনিয়ার কলোনি।

আমবাগান এলাকায় জিনিয়া নাসরিনের কোয়ার্টারে ঢুকতেই দেখা যায়, দুপুরের খাবার খাচ্ছেন এক যুবক। পরিচয় গোপন রেখে বাসা ভাড়া নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে রিপন নামের ওই যুবক নিজেকে ওই ঘরের মেয়েজামাই পরিচয় দিয়ে ভেতর থেকে শাশুড়িকে ডেকে আনেন। তার বৃদ্ধ শাশুড়ি জানালেন, কোয়ার্টার খালি নেই। এটি দু’ভাগ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তারা যে অংশে থাকেন তার ভাড়া ১১ হাজার টাকা। কোয়ার্টারের গা ঘেঁষে থাকা টিনের তৈরি একটি ঝুপড়িঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সুমি দে নামের এক নারী জানালেন, তারা তিনটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছেন। প্রতিটি কক্ষের ভাড়া ২ হাজার ২০০ টাকা করে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। রান্নায় ব্যস্ত অন্য এক নারী বললেন, চার হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে দুই কক্ষ ভাড়া নিয়ে তারা থাকছেন। রাস্তার দিকে মুখ করা একটি দোকানও দেখা গেল। ‘এসএম রেফ্রিজারেটর অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ নামের ওই দোকানের মালিক সোহেল রানা জানালেন, তিন হাজার টাকা ভাড়ায় তিনি দোকানটি নিয়েছেন। লিটন প্রতি মাসে ভাড়া তোলেন।’

এ বিষয়ে কথা বলতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর চট্টগ্রামের সিআরবি ভবনে গেলে জিনিয়া নাসরিনের অফিস কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। তার এক সহকর্মী জানান, ওই কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন। কোথায় পাওয়া যাবে জানতে চাইলে ওই সহকর্মী বলেন, তিনি আমবাগানের কোয়ার্টারে থাকেন না। এখন তিনি বাবার বাড়িতে থাকেন। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে জিনিয়া নাসরিন সমকালকে বলেন, আমার মূল বাংলোটা দুই ভাগ নয়, তিন ভাগ করেছি। দুটি অংশ ভাড়া দিয়েছি। একটি অংশের বড় রুমটি নিজের জন্য রেখেছি। বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতে থাকি। বর্ষাকালে অনেক সময় অফিসে যাওয়া-আসায় সমস্যা হয়। তখন বাংলো ঘরটা ব্যবহার করি।’ ঘর তুলে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, বাংলোটায় আমি ওঠার আগে থেকেই ঘরগুলো ছিল।’

আমবাগান কলোনির প্রায় সব বাংলো ও কর্মচারীদের কোয়ার্টারে দেখা গেছে প্রায় অভিন্ন চিত্র। রেলওয়ের সর্বোচ্চ সংখ্যক কোয়ার্টার রয়েছে খুলশীর পাহাড়তলী এলাকায়ও। পাহাড়তলী হাসপাতালের দু’পাশে গা ঘেঁষে রয়েছে এই কলোনি। এখানকার একটি কোয়ার্টারে ঢুকে জানা গেল সেটি টিকিট চেকার মো. শাহাদাতের। কোয়ার্টারের আঙিনা হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাখা জায়গায় ছয়টি পাকাঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ভাড়া দেওয়া হয়েছে কোয়ার্টারটিও। এখানে বিজন চৌধুরী, কৃষ্ণ চৌধুরী, রুপন দাশ, গণেশ ও শিউলীসহ ছয়জন পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন। প্রতিটি ঘরের ভাড়া চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা।

খোঁজ নিতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে জানা গেল, শাহাদাত রেলের কমকর্তা জিনিয়ার চাচাতো ভাই। জিনিয়া রেলওয়ে শ্রমিক লীগের প্রভাবশালী নেতা লোকমান হোসেনের মেয়ে। বর্তমানে তিনি অবসরে রয়েছেন।

একই কলোনির এন-১৪ নম্বরের একটি বাসায় ঢুকে একই চিত্র চোখে পড়ে। কোয়ার্টারটি বরাদ্দ নিয়েছেন মো. সেলিম নামে এক রেল খালাসি। তিনিও টিন দিয়ে প্রায় ১৪-১৫টি কক্ষ তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন। হাসপাতালের আরেক পাশে ১৭/এ নম্বর বাসায় ঢুকে জানা গেল বাসাটি গীতা বালা নামে রেলের এক পরিচ্ছন্নকর্মীর। তিনিও কোয়ার্টারের খালি জায়গা ভরাট করে কয়েকটি টিনের ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন। এখানকার সব বাংলো-কোয়ার্টারে মিলল প্রায় একই চিত্র।

রেলওয়ের কয়েক কর্মকর্তা জানান, বাসা বাণিজ্য নিয়ে বড় দাগের প্রশ্ন উঠলে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা তৈরি করা হয়। তবে ওই পর্যন্তই। এই উপরি আয়ের কারণে বাসা ছাড়তে হয়েছে কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ অন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। নিয়ম অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি বাসা বরাদ্দ নিয়ে অন্য কাউকে ভাড়া দিলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর শাস্তি হিসেবে বদলি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিরও সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সৈয়দ ফারুক আহমদ বলেন, আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসাবাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই বাসা ভাড়া দেওয়া হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা আইনের লঙ্ঘনও। রেলের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এটা করছেন তাদের তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে গেলে অর্থ বরাদ্দ ও ম্যাজিস্ট্রেট লাগে। এসব কারণে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। আবার সেই তালিকা হালনাগাদ করে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র দৈনিক সমকাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here