দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের নির্বাসিত জীবনের ইতি ঘটিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার দেশের মাটিতে পা রাখছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে ৬ হাজার ৩০৯ দিন নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটবে। আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীর দৃষ্টি থাকবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং পূর্বাচলের বিশাল মঞ্চের দিকে। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতাকে বরণ করতে প্রস্তুত বিএনপি। এখন ঢাকামুখী লাখ লাখ মানুষ। দেশজুড়ে বইছে উৎসবের আবহ। যেন এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে দেশ।
এদিকে, তারেক রহমানের সংবর্ধনায় বিএনপি শক্তির মহড়া দেখাবে বলে অনেকেই মনে করছেন। বিপুল লোকসমাগম ঘটবে এমনটি মাথায় রেখে নানামুখী প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দলটি এরই মধ্যে বিভিন্ন কমিটিসহ সার্বিক নিরাপত্তায় নিজস্ব উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছে। বিশাল জনসভার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যগত বিষয়টি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপির চিকিৎসক সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।
রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ অ্যাম্বুলেন্স ও সংবর্ধনার স্থানের প্রবেশমুখে এবং আশপাশে ৩টি মেডিকেল বুথ থাকবে। যেখান থেকে যে কেউ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব জাগরণ তৈরি হয়েছে। দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সব প্রান্তের লাখো নেতাকর্মী এখন ঢাকামুখী। বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যে যেভাবে পারছেন, প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিতে রাজধানীতে জড়ো হচ্ছেন।
দেশে ফেরার প্রস্তুতি সেরেছেন তারেক রহমান: তারেক রহমানের দেশে ফেরার সার্বিক প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ট্রাভেল পাস হাতে পেয়েছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইটে টিকিট বুকিং করেছেন। ফ্লাইটটি
২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। সব ঠিক থাকলে উড়োজাহাজটি ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে। এই ফ্লাইটে তারেক রহমানের পাশাপাশি আরও পাঁচ সফরসঙ্গীর টিকিট বুকিং দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান।
দলে দলে ঢাকায় আসছেন নেতাকর্মীরা: গতকাল থেকেই দলে দলে ঢাকায় আসা শুরু করেছেন প্রত্যন্ত এলাকার নেতাকর্মীরা। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে প্রত্যন্ত এলাকার নেতাকর্মীদের দেখা গেছে। বগুড়া থেকে আসা এক তৃণমূল কর্মী বলেন, আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছি। প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে এবং তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা জানাতেই আমরা এসেছি।
এদিকে মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার প্রবাসী নেতাকর্মী এরই মধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন।
চিকিৎসাসহ অন্যান্য প্রস্তুতি: ব্যাপক লোকসমাগমের ফলে যে কেউ অসুস্থ হতে পারেন বা সমস্যায় পড়বেন এমনটি বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যাপ্ত খাবার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে আগামীকাল। ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ গতকাল কালবেলাকে জানান, তারা এরই মধ্যে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন এবং সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কমিটি গঠন করে দায়িত্ব বণ্টন করেছেন। এর মধ্যে পুরো ঢাকা মহানগরীতেই থাকবে ২৫-৩০টি মোবাইল অ্যাম্বুলেন্স। সংবর্ধনা স্থানের দুই প্রান্তে এবং কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোট তিনটি মেডিকেল বুথ থাকবে। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। ঢাকার প্রবেশপথগুলোয় থাকবে মেডিকেল টিম। যেখানে একজন ডাক্তার ও নার্স বা টেকনিশিয়ান থাকবেন।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন রাজধানীতে কয়েক হাজার বোতল বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু। তিনি গতকাল কালবেলাকে বলেন, বহু বছর পর দেশে ফিরছেন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন দিবসে ঢাকায় মানুষের ঢল নামবে। প্রচুর লোকসমাগমে যাতে মানুষ কষ্ট না পায়, সেই বিবেচনায় কয়েক হাজার পানির বোতল তিনি বিতরণ করবেন। এরই মধ্যে পানির বোতলে তারেক রহমানের ছবি যুক্ত করে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বরণ করতে প্রস্তুত বিএনপি: দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে রাজধানীর পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় তৈরি করা হয়েছে বিশাল সংবর্ধনা মঞ্চ। মঞ্চ তৈরির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। ঢাকা জেলা প্রশাসন এরই মধ্যে এই গণসমাবেশ ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় অর্ধকোটি মানুষের সমাগম ঘটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০০ ফিট এলাকাকে কেন্দ্র করে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে মাইক বসানো হয়েছে, যাতে আগত জনতা প্রিয় নেতার বক্তব্য শুনতে পারেন। ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং দলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
নতুন যুগের সূচনা: বিএনপির শীর্ষ নেতা এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার উপস্থিতি দলের নেতাকর্মীদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান কালবেলাকে বলেন, তারেক রহমান শুধু একটি দলের নেতা নন, তিনি বর্তমান বাংলাদেশের তারুণ্যের প্রতীক। দীর্ঘ নির্বাসন জীবন কাটিয়ে তার এই ফিরে আসা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে পূর্ণতা দেবে। আমরা শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সফল করতে চাই।
গতকাল দুপুরে সংবর্ধনা মঞ্চের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। যিনি তারেক রহমানকে সংবর্ধনা জানানো কমিটির সদস্য সচিব। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সংবর্ধনায় মানুষের মহামিলন হবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন জনগণের প্রিয় নেতা তারেক রহমান। সেদিন তারেক রহমানের সংবর্ধনায় অর্ধকোটি মানুষের উপস্থিতি আশা করছেন তিনি।
রিজভী বলেন, অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি দল থেকেও সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারও তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তরিক। দেশে পৌঁছানোর পর তারেক রহমান প্রথমে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এরপর এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে তার মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন।
তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে আসা বিশাল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে যেন সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো ক্ষতি না হয় এবং যানজট যেন অসহনীয় পর্যায়ে না পৌঁছায়, সেদিকেও নজর দিচ্ছে বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সুশৃঙ্খলভাবে চলাফেরা করতে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং জেলা প্রশাসনও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।



