পবিত্র মাহে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু এই সময়টাতে এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী কালোবাজারি, মজুদদার ও মুনাফাখোর ব্যবসায়ী মরিয়া হয়ে ওঠে। পণ্য মজুদ রেখে তারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এমন পরিস্থিতি জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অসৎ ব্যবসায়ীদের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে বাজারপ্রক্রিয়াকে রক্ষার জন্য ইসলাম বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য মজুদদারি, মুনাফাখোরি ও প্রতারণা নিষিদ্ধ করেছে। অধিক মুনাফার প্রত্যাশায় পণ্য মজুদ করা অবৈধ ঘোষণা করেছে। হানাফি মাজহাব মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করা মাকরুহ তাহরিমি (হারাম সমতুল্য)। অন্য মাজহাব মতে এটি হারাম। কেননা এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বহু মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিনের খাবার মজুদ রাখে, সে আল্লাহপ্রদত্ত নিরাপত্তা থেকে বেরিয়ে যায়।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ২০৩৯৬)। অন্য হাদিসে এসেছে : ‘যে ব্যক্তি (সংকট তৈরি করে) খাদ্যশস্য গুদামজাত করে সে অপরাধী।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ১৬০৫)। আল্লামা ইবনে হাজর হাইতামি (রহ.) গুদামজাত করে মূল্যবৃদ্ধি করাকে কবিরা গুনাহ বলে উল্লেখ করেছেন। (নিহায়াতুল মুহতাজ : ৩/৪৫৬)
সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি করে বিত্তশালী হয়ে গেলেও কোনো লাভ নেই। এ অবৈধ সম্পদ পরকালে জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হবে। দুনিয়ার জীবনেও তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেউ যদি খাদ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৩৮)
তবে গুদামজাত পণ্য যদি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু না হয় কিংবা এসব পণ্য ব্যবহারের চাহিদার অতিরিক্ত হয় বা গুদামজাতকারী বর্ধিত মুনাফা অর্জনের অভিলাষী না হয়, তাহলে পণ্য মজুদ রাখা অবৈধ নয়।
মজুদদারি না করে সৎ নিয়তে ব্যবসা করা ইবাদত। এমন ব্যক্তির উপার্জন আল্লাহতায়ালা বরকতময় করে দেন। তাকে অপ্রত্যাশিত রিজিক দেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘খাঁটি ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় আর পণ্য মজুদদকারি অভিশপ্ত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৫৩)
নিম্ন আয়ের মানুষকে জিম্মি করে, তাদের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে মজুদদারি ও কালোবাজারি করা জুলুম। জুলুম সমাজের শান্তি ও স্থিতি বিনষ্ট করে, সুখ ও সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। তাই ইসলাম মানুষকে ইনসাফে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং জুলুম করতে নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করে জুলুম করতে চায়, আমি তাকে বেদনাদায়ক শাস্তি দেব।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৫)
এ আয়াতকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামি আইনজ্ঞরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মজুদদারি ও সিন্ডিকেট করাকে হারাম বলেছেন। কেননা এটি গণমানুষের ওপর অবিচার। (আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল-কুয়েতিয়্যা, খ–২, পৃষ্ঠা-৯১)
মহানবী (সা.) মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য মদিনায় ইসলামসম্মত বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বনু কায়নুকা গোত্রের ওই বাজার পরিচালনার দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। এ বাজারটির বৈশিষ্ট্য ছিল সেখানে কোনো ধরনের প্রতারণা, ঠকবাজি, ওজনে কম দেওয়া বা পণ্যদ্রব্য মজুদ করে মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
একদিন মহানবী (সা.) এক বিক্রেতার খাদ্যের স্তূপের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তার হাত ওই খাদ্যের স্তূপে প্রবেশ করান। এতে তার হাত ভিজে যায়। তিনি অনুপযুক্ত (ভেজাল) খাদ্যের সন্ধান পান। তখন রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মত নয়।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ১০২)
ইসলাম ব্যবসায়ীকে মুনাফা থেকে বঞ্চিত করে না। তবে জালিয়াতি, ঠকবাজি, ভেজাল মেশানো ও দালালি ইসলামে নিষিদ্ধ। কাউকে জিম্মি করে বা তার অজ্ঞতার সুযোগে অধিক মুনাফা অর্জন হারাম। কিন্তু সাধারণভাবে ব্যবসা করা ও মুনাফা অর্জন বৈধ। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বর্ধিত মুনাফা অর্জনের প্রচেষ্টা একটি সামাজিক অপরাধ। সামাজিকভাবেই এর প্রতিরোধ করতে হবে। রাষ্ট্র বাজার নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সেল গঠন করতে পারে। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে পারে, যেমনটা খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে করা হয়েছিল।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা



