ক্ষমতার জোরে বুক ফুলিয়ে রাজপথে মিছিলের দেখা মিললো খুনের মামলার আসামি আকবর শাহ থানা ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল সিদ্দিকীর। মিছিলে অগ্রভাগে ব্যানারের একেবারেই সামনে থাকা জুয়েলে শারীরিক অবস্থানই জানান দিল যেন ধরাছোঁয়ার একেবারেই বাইরে তিনি। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। অথচ পুলিশের চোখে ওই ছাত্রলীগ নেতা ‘পলাতক’।
শহিদুর রহমান রনি হত্যামামলার ওই আসামি দলবল নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরলেও পুলিশ ধরছে না—এমন অভিযোগ এনে রনির পরিবার সংবাদ সম্মেলনও করেছিল। এতে কোন প্রতিকার পায়নি। বরং মামলা তুলে নিতে ছাত্রলীগ নেতাদের হুমকি-ধমকিতে বাসা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অসহায় পরিবারটি।
চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মচারী নিয়োগে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিতে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিছিল ও সমাবেশ করে মহানগর ছাত্রলীগ। আর সেই মিছিলের অগ্রভাগে দেখা গেছে আকবরশাহ এলাকায় শহিদুর রহমান রনি হত্যামামলার অন্যতম আসামি আকবরশাহ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল সিদ্দিকীকে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এই হত্যা মামলার আসামি ঘুরলেও তাকে গ্রেফতার করছে না পুলিশ।
গত ২৮ জুলাই উত্তর কাট্টলীর আমানত উল্লাহ শাহ পাড়ায় ছোট বোনকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার প্রতিবাদ করায় বখাটের হামলায় খুন হন বড় ভাই শহিদুর রহমান রনি। এ ঘটনায় নিহতের বোন রেশমী আক্তার বাদী হয়ে জুয়েলসহ আরও তিন জনের নামে নগরীর আকবরশাহ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় আসামিদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও তাদের রহস্যময় কারণে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
এই হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করায় উল্টো বাদির পরিবারকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ হত্যা নিয়ে কতিপয় পুলিশ কর্তাদের অবহেলার অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলনও করেন শহিদুর রহমান রনির হত্যামামলার বাদি নিহতের ছোট বোন রেশমী আক্তার।
নিহতের বোন ও মামলার বাদী রেশমী আক্তার বলেন, আসামিদের গ্রেফতারের জন্য থানায় বারবার অনুরোধ করেছি আমরা। এ সময় আকবরশাহ থানা থেকে জানানো হয়েছে, বড় বড় নেতাদের জন্য জুয়েলকে আটক করা যাচ্ছে না।
রেশমী আক্তার আরও জানান, মামলা করার পর আসামিরা এলাকার সন্ত্রাসী আলতাফ, ঠেস লোকমানকে দিয়ে নিহতের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে। সে কারণে নিহতের পরিবার আগের বাসা পরিবর্তন করে বর্তমানে অন্য স্থানে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছে।
এ ব্যাপারে আকবরশাহ থানার ওসি মোহাম্মদ জহির চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি থানায় নতুন যোগদান করেছি। আমি বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’
কেন হত্যামামলার একজন আসামি ছাত্রলীগের মিছিলের অগ্রভাগে থাকবে— তা জানতে চাইলে নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, ‘আমরা কাউকে ধরে ধরে আনিনি। সে নিজ থেকে এসেছে। আর তার এখনও সাজা হয়নি। তাই সে অপরাধী কিনা তা আমরা বলতে পারি না।’
জুয়েলের বিরুদ্ধে মহানগর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে আদালতে প্রমাণ হোক সে অপরাধী, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আকবরশাহ থানা ছাত্রলীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা অভিযোগ করে বলেন, ‘পারিবারিকভাবে বিএনপির রাজনীতি করলেও মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরের খালাতো ভাই হিসেবে পরিচিত জুয়েল সিদ্দিকীকে অনেকটা জোর জবরদস্তি করে সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে। জুয়েলের বড় ভাই ১০ নং ওয়ার্ড যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং বিএনপির ডাকা হরতালের সময় নাশকতাসহ কয়েকটি মামলার আসামি।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, উত্তর কাট্টলীতে এলাকায় ইয়াবাসহ মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা পান জুয়েল। চাঁদা না দিলে কৌশলে ফাসিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ২৫ জুলাই শহিদুর রহমান রনির বোন রেশমীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর জুয়েল, শহীদসহ আরও কয়েকজন মিলে রেশমীকে রাস্তায় মারধর ও হুমকি দেয়।
এ ঘটনার পর রেশমী আকবরশাহ থানায় জুয়েলসহ আরও তিনজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে। মামলা করার পরদিনই আসামিরা রেশমীর বাড়ির সামনে গিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দেয় এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।
এই ঘটনার তিন দিন পরই শহিদুর রহমান রনির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। রনিকে হত্যার পর গলায় ওড়না বেধে ঝুলিয়ে দিয়ে আসামিরা পালিয়ে যায় বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে।



