শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

আইসিইউর জন্য হাহাকার

প্রকাশিত :

spot_img

 

শ্বাসকষ্ট থাকায় সপ্তাহখানেক আগে কোভিড আক্রান্ত বাবাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করায় হাটহাজারীর বাসিন্দা কামরুল ইসলাম। গত দুইদিন আগে শারীরিক অবস্থা অবনতি হয় ষাটোর্ধ্ব বাবার। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, দ্রুত বয়োবৃদ্ধকে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে কোন আইসিইউ শয্যাই খালি ছিল না চমেক হাসপাতালে।

নিজের চোখের সামনে বাবার শারীরিক কষ্ট দেখে কামরুল আইসিইউ শয্যার জন্য ছুটে আসেন বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে। কিন্তু সেখান থেকে জানানো হয় তাতেও কোন শয্যা খালি নেই। একে একে আশপাশের অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও আইসিইউ শয্যার জন্য ছুটে বেড়ান এ যুবক। কিন্তু দৌড়ঝাঁপ পুরোই বৃথায় যায় তার। কোথাও পাওয়া যায়নি একটি শয্যা।

কামরুল বলেন, অন্তত দশটি হাসপাতালে গিয়েছি। সবার একই কথা। সরি এই মুহূর্তে কোন শয্যা খালি নেই, বরং আমাদের ভর্তি রোগী অপেক্ষায় আছেন। একদিন পেরিয়ে গেলেও হন্য হয়ে খুঁজেও বাবার জন্য একটি আইসিইউ শয্যা জোগাড় করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত বাবা চলে গেলেন চিরতরে।

কামরুলের এমন কথা হয়তো কেউ জানতেন না। তবে গত তিনদিন ধরে চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে আলোচনা হচ্ছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ছেলেকে বাঁচাতে মমতামীয় মা নিজেই তাঁর আইসিইউ শয্যা ছেড়ে দিয়ে চিরবিদায়ের কথাটি। কামরুল কিংবা গর্ভধারণী মা-ই নয়। আইসিইউ শয্যার অভাবে এমন প্রাণ দিতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। যার হিসেবও হয়তো কারোরই জানা নেই।

চট্টগ্রামের চিত্র এখন, শুধু করোনা রোগী স্বজনদের হাহাকার আর হাসপাতাল হাসপাতাল ছোটাছুটির। সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালগুলো কান পাতলেই শোনা যায় আইসিইউ শয্যাতো দূরে থাক, সাধারণ শয্যাও খালি নেই কোথাও। ধীরে ধীরে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে অক্সিজেনেরও। রাতদিন লড়ে যাওয়া চিকিৎসকরাও যেন এখন অসহায়। কেবল চোখের সামনে মৃত্যু দেখা ছাড়া তাদেরও যেন কিছুই করার থাকে না। করুণ বাস্তবতা হচ্ছে, একজন রোগীর মৃত্যুর পরই কেবল আইসিইউ শয্যা মিলছে অপেক্ষারত অন্য রোগীদের। তাও আবার সবার ভাগ্যেও জুটছেনা ‘সোনার হরিণ’ এই আইসিইউ। হাসপাতালগুলোর ওপর যে হারে রোগীর চাপ বেড়েছে, তাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রমের শঙ্কা স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।

তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি আইসিইউ শয্যা রয়েছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। ১৮টি শয্যা থাকলেও গেল তিন সপ্তাহ ধরে এক ঘণ্টার জন্যেও একটি শয্যা খালি হয়নি। বরং এক শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে থাকা অন্য রোগীদের মধ্যে ১৫ জনের জন্য আবেদন থাকে শয্যা পাওয়ার। তার চেয়ে ভয়ঙ্কর চিত্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের। সেখানে দশ শয্যার আইসিইউ থাকলেও একটি শয্যার জন্য অপেক্ষায় আছেন অন্তত ২০ জনের।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও হাসপাতালের কোভিড-১৯ কোর কমিটির ফোকাল পার্সন ডা. সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পরিস্থিতিটা এখন এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, এক রোগীর মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে অন্য রোগীর স্বজনদের। একটা শয্যা খালির খবর পেলে অন্য রোগীর স্বজনরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। যেহেতু শয্যা একটি, তাই রোগীর অবস্থা বিবেচনা করেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। অন্যদের এইচডিইউতে রেখে হাইফ্লো দিয়ে সেবা দেয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডের প্রধান ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, ‘গত তিন সপ্তাহ ধরেই সব আইসিইউ শয্যা রোগীতে পূর্ণ থাকছে। পরিস্থিতি এমন, একটা শয্যার জন্য হাসপাতালরই ভর্তিকৃত অন্য রোগীদের ১০-১৫ জনের আবেদন থাকে। এছাড়া অন্য হাসপাতাল থেকেও অন্তত ৫/১০টা ফোন আসেই। খুবই নাজুক একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।’

সরকারি হাসপাতালগুলোর চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে বেশি আইসিইউ শয্যা থাকলেও গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন হাসপাতালেই খালি ছিল না একটি আইসিইউ শয্যা। বরং দুইটি হাসপাতালে নতুন ১৪টি আইসিইউ শয্যা বাড়ানো হলেও তা দিনেই রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সাধারণ শয্যাও বাড়ানো হয়েছে বেশ কয়েকটি হাসপাতালে। কিন্তু তাতেও কাটছে না শয্যা সংকট। এমন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, সামনে মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।

বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক এবং ম্যাক্স হাসপাতালের এমডি ডা. লিয়াকত আলী বলেন, সবগুলো হাসপাতালেই কম বেশি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তবুও চারদিক থেকে ফোন আসছে, একটি আইসিইউ ব্যবস্থা করে দিতে। কিন্তু আমারাও নিরুপায় এখন। এই মুহূর্তে কোন হাসপাতালেই আইসিইউ দূরে থাক, সাধারণ শয্যাও খালি পাওয়া দুষ্কর। একটি ঘণ্টার জন্যও কোন আইসিইউ খালি থাকছে না।

বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এটিএম রেজাউল করিম বলেন, ‘সাধারণ শয্যার মতো আইসিইউ শয্যা সংকট থাকায় দুটোই বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ২৪ আইসিইউসহ শতাধিক শয্যাই রোগী ভর্তি। প্রতিদিনই অন্তত ২০-২৫ জন যোগাযোগ করছেন, শয্যা বা আইসিইউ কিছুই দিতে পারছি না।’

জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ১৬টি মাস পেরিয়ে গেছে। এরপরও স্বাস্থ্য বিভাগ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। দেড় বছর চলে গেলেও চট্টগ্রামে প্রয়োজনীয় আইসিইউ শয্যা বাড়নো যায়নি। বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে দেখা যাবে সামনে চিকিৎসা ছাড়াই রোগীদের মরতে হচ্ছে। এটি পুরোই উদ্বেগের। হয়তো আমরাও মহা বিপর্যয়ের মধ্যে যাচ্ছি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রাহমান বলেন, শুরু থেকেই চট্টগ্রামে আইসিইউ শয্যার সংকট ছিল। যে পরিমাণ সময়ে পেয়েছিল, তাতে শয্যা বাড়ানোর দরকার ছিল। কিন্তু কিছুই হয়নি। আগে যা ছিল, এখনও তা। সরকারিভাবে এটি আরও জোর দেয়া দরকার। ঈদের আগ ও পর থেকে যে পরিমাণ রোগী বাড়ছে, তেমনি দিনদিন বাড়ছে আইসিইউসহ সাধারণ শয্যার চাহিদাও। এমন পরিস্থিতিতে এসব বিষয়ে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে নজর দেয়া উচিত।

পরিস্থিতি এমন হলেও চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর বলেন, একটি রোগীকেও শয্যার বাইরে রাখা হবে না। ইতোমধ্যে রেলওয়ে ও হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে যথেষ্ট শয্যা খালি আছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজসহ সকল হাসপাতালেই শয্যা বাড়ানো হচ্ছে। আশা করে সমস্যা হবে না।

তবে তিনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষাকে দোষারোপ করে বলেন, শুরু থেকেই বলা হচ্ছে, মাস্ক পড়–ন, স্বাস্থ্যবিধি মানুন। কিন্তু কেউই কথা শুনেননি। হাসপাতালে যারাই ভর্তি হচ্ছে, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই হচ্ছে গ্রাম পর্যায়ের। তাদের উদাসীনতাতো আরও চরমে। এখনও যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যতে ভয়াবহতার সঙ্গেই দাঁড়াতে হবে।

সর্বশেষ

প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজে বিদায়, দোয়া মাহফিল ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

নিজস্ব প্রতিনিধি মিরসরাই উপজেলার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজে ২০২৬ সালের এইচএসসি...

মিরসরাইয়ে কৃষক দলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের দেশ বিরোধী কর্মকান্ড ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে কেন্দ্র ঘোষিত...

বামনসুন্দর ফকির আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সমাজকর্মী শরফু উদ্দীন

  নিজস্ব প্রতিনিধি চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বামনসুন্দর ফকির আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি...

হাইতকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন জামসেদ আলম

  মিরসরাই প্রতিনিধি চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড হাইতকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন...

আরও পড়ুন

ঠান্ডাজনিত রোগে আড়াই মাসে ৯৯ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক সারাদেশে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত অসুখসহ শীতকালীন বিভিন্ন রোগ বেড়েছে। চলমান শীতঋতুতে ঠান্ডাজনিত...

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ৩ নারীর মৃত্যু

  চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক দিনে নগরীর তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন শিউলি...

বুস্টার ডোজ দিবস কাল : দেয়া হবে ৭৫ লাখ টিকা

  করোনা সংক্রমণ রোধে আগামীকাল দেশব্যাপী বুস্টার ডোজ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এক দিনে...