রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের শয্যায় টানা ৪৫ ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন লিভার সিরোসিসসহ বহুরোগে আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালাদা জিয়া। চিকিৎসক, পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সরকার আইনি বিধিনিষেধের কথা বলে তাতে এখনো সায় দেয়নি। বিদেশে নিতে বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের সবশেষ আবেদনটির ওপর গতকাল সোমবার মতামত দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। কী মতামত দেয়া হয়েছে, সেটি আইনমন্ত্রী স্পষ্ট না করলেও বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন যে আসেনি সেটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল দুপুরে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বেগম জিয়ার পরিবারের আবেদনের উপরে আইনি মতামত দেয়া হয়েছে। এই আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যাবে। যেহেতু এই আবেদন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যাবে, তাই কী মতামত দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।
আনিসুল হক স্পষ্ট করে না বললেও এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় যে আগের অবস্থানেই রয়েছে, সেই আভাস পাওয়া যায় তার কথায়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘৪০১ ধারায় যে ৬টি উপধারা আছে, সেখানে পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড ট্রানজেকশন আবারো বিবেচনা করার সুযোগ নাই।’ ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা হলে কারাজীবন শুরু হয় খালেদা জিয়ার। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও তার সাজার রায় হয়।
দেশে করোনা মহামারী শুরুর পর খালেদার পরিবারের আবেদনে তাকে গত বছরের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। তবে শর্ত ছিল, তাকে দেশেই থাকতে হবে।
কারাগার থেকে বেরিয়ে খালেদা জিয়া ওঠেন গুলশানের বাসা ফিরোজায়। এরপর করোনায় আক্রান্ত হলে বছরের মাঝামাঝি তিনি প্রায় দুই মাস হাসপাতালে থাকেন। এরপর আরো দুই দফা তাকে হাসপাতালে যেতে হয়।
৭৬ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। সবশেষ গত ১৩ নভেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার ‘পরিপাকতন্ত্রে’ রক্তক্ষরণ এবং লিভার সিরোসিসের কথা জানান চিকিৎসকরা।
বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেই দাবি করে তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য কয়েক দফা আবেদন করেছিলেন তার ভাই। সাময়িক মুক্তির শর্তের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবারই তা নাকচ করা হয়।
এবার লিভার সিরোসিস ধরা পড়ায় খালেদাকে বিদেশে নেয়ার অনুমতি চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবারো সরকারের কাছে আবেদন করা হয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে দেখা করে স্মারকলিপি দেন বিএনপি সমর্থক ১৫ জন আইনজীবী। আর বিএনপির পক্ষ থেকে অনশন, মানববন্ধন, সমাবেশের মতো কর্মসূচি দেয়া হয়।
সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আনিসুল হক বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার বিষয়ে আবেদন বিবেচনা করতে ‘নজির’ খুঁজছেন তিনি। উপমহাদেশে কোনো আদালতে এমন ‘নজির আছে কি না’ তা দেখে ‘কিছুদিনের মধ্যেই’ সিদ্ধান্ত জানাবেন।
তবে তার আগে তিনি বলেছিলেন, দণ্ডিত খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে চাইলে তাকে আবার কারাগারে ফিরে গিয়ে সরকারের কাছে নতুন করে আবেদন করতে হবে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গতকাল তিনি বলেন, ‘আমি আইনের যে ব্যাখ্যা দিয়েছি, সেই ব্যাখ্যার কোনোখানে কোনো জাজমেন্টে দেখি নাই এটার সাথে দ্বিমত আছে। আমার ব্যাখ্যাটা সঠিক বলে আমি মনে করি।’
গত ১৩ নভেম্বর থেকে খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন আছেন। হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: শাহাবুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধানে একটি মেডিক্যাল বোর্ড তার চিকিৎসায় নিয়োজিত রয়েছেন। এই বোর্ডে এভারকেয়ার হাসপাতাল ও হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রয়েছেন।
গত ১৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর রাতে ব্যাপক রক্তক্ষরণে খালেদা জিয়া সঙ্কটজনক অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে তার চিকিৎসক ডা: এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা প্রথমে ১৪ তারিখ ৬টা ব্যান্ড করে একটার পর একটা ব্যান্ডিং করে উনার ব্লিডিংটা (রক্তক্ষরণ) ইমিডিয়েন্ট বন্ধ করতে সমর্থ হই। ১৭ তারিখ আবার ব্লিডিং শুরু হয়। আমরা লাইফ সেভিং মেডিসিন দিয়ে তাকে কিছুটা স্টেবল করতে সমর্থ হই। ২১ তারিখে মনে হলো- উনার ব্লিডিংটা স্টপ হয়েছে। পরে ২৪ তারিখ তাকে জেনারেল ওটিতে নিয়ে এন্ডোস্কোপি করা হয়। এবার মেসিভ ব্লিডিংটা আরেকটু নিচের থেকে হচ্ছে বলে মনে হলো। এটার সোর্স পর্যন্ত আমরা যেতে পারিনি। আমরা আবার তাকে লাইভ সেভিং মেডিসিন দিয়েছি, আবার ব্লাড ট্রান্সমিশন করেছি। এখন বর্তমানে ম্যাডাম জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেই আছেন।
চিকিৎসকরা জানান, রক্তক্ষরণ বন্ধে বেগম জিয়াকে অন্যান্য ওষুধের সাথে নিয়মিত ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে। তার ওজন কমে গিয়েছে। তরল জাতীয় খাবার ছাড়া কোন কিছুই তাকে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বেগম খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে দেখতে প্রায় প্রতিদিনই যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান প্রতিদিন থাকছেন খালেদা জিয়ার পাশে।



