প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা : রিজভী

242


নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকার ২১শে আগস্ট বোমা হামলায় হীন উদ্দেশ্যসাধনের জন্য প্রতিহিংসার মনোভাব নিয়েই মাঠে নেমেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি আজ বৃহস্পতিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তারেক রহমানকে ফাঁসাতেই হবে’ এই প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্যই ক্ষমতা হাতে পেয়েই বেছে আনা হয় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতা কাহার আকন্দকে। তাকে দিয়ে তারেক রহমানের নাম বোমা হামলায় জড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে এক কথা বলেন, বিদেশে বলেন অন্য কথা। নিউইয়র্কে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন- সব দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে সরকার। আসলে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। কারণ এখনো পর্যন্ত আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকারের সকল পদক্ষেপ একতরফা নির্বাচনেরই আলামত। কিন্তু এবার আর একতরফা নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুখে মধু ও অন্তরে বিষ নিয়েই তিনি বিদেশীদের সাথে কথা বলেন।

বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলা সরকার গুম, বেআইনী হত্যা, নির্দোষ মানুষদের গ্রেফতার ও মামলা দিয়ে হয়রানীর কোনো কিছুই বাদ দিচ্ছে না। এরা মানুষের মানবাধিকারকে পায়ে দলতে যে দ্বিধা করে না, তার বহু তথ্য সাবেক প্রধান বিচারপতির লেখা বই থেকে পাওয়া যাচ্ছে। সাগর-রুনী হত্যার এখনও কুল-কিনারা করতে পারেনি, অথচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে- এস কে সিনহা একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন- সাগর-রুনী হত্যার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানেন। আসলে অনাচারের ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে যাওয়াতে সরকার এখন দিশেহারা। সরকার ক্ষমতার উন্মাদনা মধ্যে থাকতে চায়, এজন্য যখন যেটা প্রয়োজন অর্থাৎ গুম, খুন থেকে শুরু করে মিথ্যা মামলায় বিরোধী নেতাদের ফাঁসাতে দ্বিধা করছে না। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের হাতের মুঠোয়। আর এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে দিয়েই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বোমা হামলার মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বিরোধী দল ও মতকে নির্মূলের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। এসময় দলের কেন্দ্রীয় নেতা আহমেদ আযম খান, ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, আব্দুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘শত চেষ্টা করেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ২১শে আগস্ট বোমা হামলা মামলায় জড়াতে পারেনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আন্দোলনের ফসলরা। তাদের সময় আদালত চার্জশিট একসেপ্ট করে ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। কেউই তারেক রহমানের কথা বলেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার মনপছন্দ কাহার আকন্দ কেরামতি দেখাতে শুরু করে মামলাটি পুনঃতদন্তের নামে বিচারিক আদালত থেকে ফিরিয়ে এনে এক নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। উদ্দেশ্য একটাই তারেক রহমানকে মামলায় জড়ানো।’

তিনি বলেন, ‘অত্যাচার, নিষ্ঠুর পীড়ণের মাধ্যমে একমাত্র যার জবানবন্দীর ওপর ভিত্তি করে তারেক রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়, সেটি ছিল মুফতি হান্নানের। কাহার আকন্দের তদন্ত চলাকালীন ২০১১ এর ৭ই এপ্রিল মুফতি হান্নানকে দিয়ে বলানো হয়, সে-ই হামলাকারীদের সাথে তারেক রহমান সাহেবের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিল! ইত্যাদি। মূলত: এর উপর ভিত্তি করেই সাাজনো চার্জশিটের কারিগর কাহার তার ‘চার্জশিট প্রহসন’ রচনা করে তা আদালতে দাখিল করে।’

রিজভী বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্র্রেট কর্তৃক এমন জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করার পর থেকেই তা প্রত্যাহারের জন্য সুযোগ খুঁজছিলেন মুফতি হান্নান। কিন্তু তদন্তকালে তা প্রত্যাহার করলে তাকে পুনরায় রিমান্ডে নিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ মৃত্যুবরণ করতে হবে আশঙ্কায় সে প্রহর গুনতে থাকে চার্জশিট দাখিলের। কেননা, কোনো মামলায় চার্জশিট প্রদানের পর সেই আসামিকে আর ওই মামলায় রিমান্ডে নেয়ার সুযোগ পুলিশের থাকে না। অবশেষে সেই সুযোগ তিনি পেয়ে যান গত ২০১১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর। তারই বিবরণ এখন উল্লেখ করছি। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিনের আদালতে পূর্বের জোর করে নেয়া জবানবন্দী প্রত্যাহার করে নিয়ে লিখিতভাবে তিনি জানান- অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক জবানবন্দী নেয়া হয়েছিল। পূর্ববর্তী জবানবন্দীতে উল্লিখিত সমস্ত তথ্য তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দের লেখা। নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক এতে স্বাক্ষর নেয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই অন্য এক ব্যক্তি তার হাত ধরে তাতে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়।’

বিএনপির এই নেতা জানান, ‘মুফতি হান্নান বলেন, রাজনৈতিক নেতা এবং নিজের জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে তার ওপর অমানুষিক বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে। উলঙ্গ করে বৈদ্যুতিক শক; নাকে, কানে, জিহবাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বৈদ্যুতিক চার্জ, বেধড়ক লাঠিপেটা ছাড়াও তার দু’হাতের ৯টি আঙ্গুলের নখ তুলে ফেলা হয়। তার আগে প্রত্যেকটি আঙ্গুলের মাথায় আলপিন ঢোকানো এবং আঙ্গুলের অগ্রভাগ গ্যাস লাইট দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। পায়ের আঙ্গুলগুলো তারা পাথর দিয়ে থেঁতলে দেয়। সম্মুখভাগে হাজার ভোল্টের বাল্ব জ্বালিয়ে রেখে মুখসহ বিভিন্ন জায়গা ঝলসে দেয়া হয়। পা ওপরের দিকে দিয়ে মাথা নিচের দিকে রেখে ঝুলিয়ে রাখা হতো জিজ্ঞাসাবাদের সময়। এছাড়া ভেজা গামছা নাকে ও মুখে রেখে মরিচ মিশ্রিত গরম ও ঠান্ডা পানি ঢালা হতো। অনেক সময় আদিম বর্বর যুগের মতো নির্যাতন করা হতো। বর্বরতার চূড়ান্ত পর্যায়ে কাটিং প্লায়ার্স দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়াও তুলে ফেলা হতো। দাঁত টেনে তুলে ট্রের উপর রাখা হতো। বৈদ্যুতিক ঘুরন্ত চেয়ারে তাকে ঘোরানো হতো। তিনি আরো বলেন- আমি (হান্নান) উপরোক্ত গ্রেনেড হামলা মামলার ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানি না। কোনো প্রকারে জড়িতও নই এবং কারা এর সাথে জড়িত তাও আমি জানি না। আমি কখনোই এই মামলার আসামি ছিলাম না এবং আমাকে উক্ত মামলার আসামি হিসাবেও গ্রেফতার করা হয় নাই। এভাবে মুফতি হান্নানকে ভয়-ভীতি, নৃশংস শারীরিক নির্যাতন, লোভ-লালসাসহ ২০৩ দিন রিমান্ডে নিয়ে উপরোল্লিখিত নির্যাতন করা হয়। মূলত সরকারের নির্দেশে নির্যাতনের সর্বোচ্চ মাত্রা প্রয়োগ করা হয় মুফতি হান্নানের ওপর, যাতে সে ২১শে আগস্ট বোমা হামলায় তারেক রহমানের নাম বলে।’

রিজভী বলেন, ‘সরকারপ্রধান তার পুঞ্জিভূত ক্রুরতা, চাতুরী, কুটিলতা ও রক্তঝরানো কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সেটির প্রথম টার্গেট করেছেন জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে। এই মামলায় তারেক রহমানের নাম জড়ানো বর্তমান সরকারপ্রধানের প্রতিহিংসা পূরণের মাস্টারপ্ল্যান।’

সারাদেশে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, গতকাল রংপুর জেলার কাজী খয়রাত, মিজানুর রহমান রন্টু, শরিফুল ইসলাম ডালেস, ফজলুর রহমান বাদল, ফিরোজ আলম, মনা, মনিরুজ্জামান মনি, সুজন খান, মোকশেদুল হক পান্না, শরিফুল ইসলাম বাবু, ইয়াসির আরাফাত জীবন, এ্যাপোলো চৌধুরী, বসুনিয়া আজাদ, আব্দুস সালাম, মেহেরপুরের গাংনীতে জামাল হোসেন, ইয়ার আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এছাড়া গতকাল সারাদেশে মোট ৭টি মামলায় ১৪৪০ জনকে এজাহার নামীয় ও অজ্ঞাত প্রায় ৫০০ জনের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবী মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমি দলের পক্ষ থেকে গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি।

রিজভী জানান, বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামালের বাসভবনে গোয়েন্দা পুলিশ হানা দিয়েছে। এছাড়া গত পরশু রাতে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপুর বাসভবনে পুলিশ হানা দিয়ে তার ছোট ভাই ও বোনসহ দুই ভাতিজাকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছে। আমি পুলিশের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here