বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জামায়াতের পলিসি সামিট ২০২৬: জনতুষ্টির বয়ানে অর্থনীতির অসংগতি

প্রকাশিত :

spot_img

জামায়াতের পলিসি সামিট ২০২৬: জনতুষ্টির বয়ানে অর্থনীতির অসংগতি

-ইঞ্জিনিয়ার তাওসিফ ইমরাজ শিহান

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক আয়োজিত ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। দলটির উপস্থাপিত উন্নয়ন কাঠামো এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি একটি সুসংগত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার চেয়ে বরং জনতুষ্টিবাদী বা ‘পপুলিস্ট’ আকাঙ্ক্ষার এক আবেগীয় তালিকা। আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জটিল সমীকরণ বোঝা প্রয়োজন, জামায়াতের প্রস্তাবনায় তার নিদারুণ অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

*রাজস্ব সংকোচন ও ব্যয়ের বৈপরীত্য*
জামায়াতের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রধান ত্রুটি হলো তাদের রাজস্ব নীতি। তারা একদিকে ভ্যাট ১০ শতাংশ এবং কর ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রের আয়কে সংকুচিত করবে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬-৮ শতাংশ বরাদ্দের মতো উচ্চাভিলাষী খরচের তালিকা দিচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে মাত্র ৯ শতাংশের আশেপাশে, সেখানে আয়ের উৎস কমিয়ে ব্যয়ের এমন অঙ্ক মেলাতে যাওয়া গাণিতিকভাবে অসম্ভব। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার যদি অপরিকল্পিতভাবে টাকা ছাপে বা ঋণ গ্রহণ করে, তবে তা মুদ্রাস্ফীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে যেখানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

*ভর্তুকি ও শিল্প-বিশৃঙ্খলা*
শিল্প খাতের জন্য ৩ বছর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রতিশ্রুতিটি পলিটিক্যাল ইকোনমির বিচারে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জ্বালানি বাজার যেখানে বিশ্ববাজারের অস্থিরতার সাথে যুক্ত, সেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সীমাহীন ভর্তুকি দিয়ে কৃত্রিমভাবে দাম ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে দেউলিয়া হওয়ার নামান্তর। এছাড়া, নতুন শিল্পের জন্য এমন সুবিধা দেওয়া হলে তা বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোর জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে। রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থী এবং এটি বিনিয়োগের সুস্থ পরিবেশ নষ্ট করে মার্কেট ডিস্ট্যাবিলাইজেশনের জন্ম দেবে।

*‘সুদমুক্ত ঋণ’ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ঝুঁকি*
তরুণ গ্র্যাজুয়েট ও বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য যে ‘সুদমুক্ত ঋণ’ বা কর্জে হাসানার কথা বলা হচ্ছে, তা আদতে একটি পপ্যুলিস্ট স্ক্যাম বা ভোট-আকর্ষণী ফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশে যেখানে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়, সেখানে বিপুল সংখ্যক তরুণকে ক্যারিয়ারের শুরুতেই বড় অংকের জামানতহীন ঋণ দেওয়া মানে তাদের ঋণের জালে আটকে দেওয়া। পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘স্টুডেন্ট লোন’ যেভাবে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে রূপ নিয়েছে, আমাদের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতে তার প্রতিফলন হবে আরও ভয়াবহ। এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে, তা নিয়ে জামায়াতের পলিসিতে কোনো দিশা নেই।

*মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার অস্পষ্টতা*
বন্ধ কারখানা পিপিপি মডেলে চালু করে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার ঘোষণাটি মূলত সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার এক অকার্যকর অনুকরণ। বেসরকারি সম্পত্তির ওপর শ্রমিকদের এমন সরাসরি মালিকানা প্রদান দেশের প্রচলিত আইনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করবে। এছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এবং লভ্যাংশ বন্টনের যে জটিলতা তৈরি হবে, তা শিল্পখাতে অস্থিরতা ও মামলা-মোকদ্দমার পাহাড় জমিয়ে তুলবে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার সুচিন্তিত কোনো নীতি নয়, বরং অভিজ্ঞতার অভাবে সৃষ্ট একটি অবাস্তব ফ্যান্টাসি।

*সক্ষমতা ও চলমান প্রকল্পের রাজনৈতিকায়ন*
স্মার্ট সোশ্যাল কার্ড বা জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল—এগুলো মূলত একটি রাষ্ট্রের চলমান প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের অংশ। বিদ্যমান তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে পাশ কাটিয়ে মেগা প্রজেক্টের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা প্রমাণ করে যে, জামায়াত কাঠামোগত সংস্কারের চেয়ে দৃশ্যমান মেগা প্রজেক্টের দিকেই বেশি আগ্রহী। এছাড়া সব শিশুকে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদী সাপ্লাই চেইন সম্পর্কে দলটির কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই।

রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো আবেগ বা সাংগঠনিক সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি গাণিতিক বাস্তবতা এবং সুশৃঙ্খল নীতিনির্ধারণের বিষয়। জামায়াতের পলিসি সামিট থেকে এটা স্পষ্ট যে, দলটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জটিল অর্থনৈতিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ। তাদের প্রস্তাবনাগুলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রের ছবি না এঁকে বরং একটি ‘বিলাসবহুল চাহিদাপত্র’ তৈরি করেছে, যার আর্থিক ও আইনি ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এমন আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখানো দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হতে পারে।সদিচ্ছার আধিক্য থাকলেও কৌশলগত অদূরদর্শিতা এবং বাস্তববিমুখ চিন্তা জামায়াতের এই রূপরেখাকে একটি ‘আবেগের তালিকায়’ পরিণত করেছে, যা বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কেবল একটি মরিচিকাই তৈরি করবে।

ইঞ্জিনিয়ার তাওসিফ ইমরাজ শিহান
আহ্ববায়ক
জিয়া সাইবার ফোর্স – জেডসিএফ
চট্টগ্রাম ঊত্তর জেলা।

সর্বশেষ

Casino Mallorca tragaperras: registro paso a paso y guía práctica

¿Qué es Casino Mallorca y por qué enfocarse en sus tragaperras?Registro paso a paso...

Best Non-GamStop Casinos in the UK

Best Non-GamStop Casinos in the UK ...

भारत में 1 X Bet – मोबाइल गेमिंग और उपयोगकर्ता अनुभव

भारत में 1 X Bet - मोबाइल गेमिंग और उपयोगकर्ता अनुभव ...

Mostbet लॉगिन – भारत में सुरक्षित अकाउंट एक्सेस और प्रबंधन

Mostbet लॉगिन - भारत में सुरक्षित अकाउंट एक्सेस और प्रबंधन ...

আরও পড়ুন

উচ্চশিক্ষার রূপান্তর ও আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: একটি উন্নয়নের রোডম্যাপ

উচ্চশিক্ষার রূপান্তর ও আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: একটি উন্নয়নের রোডম্যাপ - ইঞ্জিনিয়ার তাওসিফ ইমরাজ শিহান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক...

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের সুরতহাল

ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান     ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে বীরত্বগাথা ও রাজনীতিবিদ হিসাবে চরিত্র...

চয়েস বাস কি এখন কেউ ‘চয়েস’ করে!

  মনিরুল হোসেন টিপু » চয়েস বাস নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ অনেক প্রতিবাদ, লেখালেখি হচ্ছে কিন্তু অবস্থার...