তারুণ্যের মহাজাগরণ: স্ফূলিঙ্গ কিন্তু ক্রমেই দাবানল হয়ে উঠছে

410
একটি দ্রুত গতির বাসের চাপায় রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর ট্রাজিক মৃত্যুর পর গত এক সপ্তাহ ধরে রাজধানী কার্যত অচল হয়ে গেছে। শিশু-কিশোরদের এমন প্রতিবাদ বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে আর দেখা যায়নি। হাজার-হাজার লাখ লাখ কিশোর-কিশোরী স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা সৃজনশীল বিভিন্ন উপায়ে প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছি তারুণ্যের এই মহাজাগরণ!

সড়কপথে নিরীহ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দেশে নিয়মিত চিত্র। গড়ে প্রতিদিন ৮-১০জন মানুষের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। এই নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে অনেক কথাবার্তা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ কখনও গ্রহণ করা হয়নি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, প্রশিক্ষণহীন চালক, চাঁদাবাজি, মাফিয়াবাজি, বিআরটিএর দুর্নীতিসহ নানা অব্যবস্থার কারণে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষের জীবন হারাচ্ছেন। অথচ যুগের পর যুগ ধরে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগগুলো মাটি-চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভুত ক্ষোভ এবার শিশু-কিশোরদের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটেছে। একথা ঠিক যে বর্তমান পরিবহন সেক্টরে যে সিস্টেম চালু আছে এতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কেউ-ই নিরাপদ নন। আজকে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে রাস্তায় যে আন্দোলন করছে, সেটা বড়দের করার কথা ছিল। এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের কথা ছিল রাষ্ট্রের। কিন্তু শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্র এবং বড়রা ব্যর্থ হয়েছে।

এবারের এই তারুণ্যের মহাজাগরণ অনেক নতুন কিছু নিয়ে এসেছে। নতুন অনেক কিছু শিখিয়েছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে সৃজনশীল স্লোগানে। অভিনব কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের সমস্যাগুলোকে সহজ কথায় বুঝিয়ে দেয়ার সব স্লোগান।

স্লোগানগুলো একটু খেয়াল করুন: ‘শিশুরা পড়তে এসেছে মরতে নয়’, ‘ যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ’, ‘হয়নি বলে আর হবে না/আমরা বলি “বাদ দে!’/লক্ষ তরুণ চেঁচিয়ে বলে/”পাপ সরাবো হাত দে’, ‘৪৭ বছরের পুরানা রাষ্ট্রের সংস্কার কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’, ‘আমরা যদি না জাগি মা ক্যামনে সকাল হবে’, ‘বিবেক তবে কবে ফিরবে?’ ‘মুজিব কোটে মুজিবকেই মানায়, চামচাকে না’, জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে অন্তত তিনদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হবে‘, ‘মা তুমি আমার জন্য আর অপেক্ষা করো না, আমি আর ঘরে ফিরবো না’, ‘আমরা ৯ টাকায় ১ জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘4G স্পিড নেটওয়ার্ক নয়, 4G স্পিড বিচার ব্যবস্থা চাই’, ‘পুলিশ আংকেল, আপনার চা-সিগারেটের টাকা আমি আমার টিফিনের টাকা দিয়ে দিচ্ছি। তাও আপনি এসব গাড়ি চালাতে দিয়েন না’, ‘পুলিশের গাড়ির লাইসেন্স নাই’, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘বিচার চাই না, বিচার করতে হবে’ ‘ শিক্ষকের বেতের বাড়ি নিষেধ যে দেশে, পুলিশের হাতে লাঠি কেন সেই দেশে’, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রদের আপাতত রাস্তা সামলাতে দিন মন্ত্রী পুলিশকে স্কুলে পাঠান শিক্ষিত করতে’, ‘we want justice ‘, ‘দেশে একসময় বয়স্ক শিক্ষা স্কুল ছিল নিরক্ষরতা দূর করার জন্য। সেই স্কুল আবার দরকার কর্তাব্যক্তিদের ‘সেন্স’ ফিরিয়ে আনার জন্য’।

দেশের রাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি, এমপি-মন্ত্রী সবারই এই স্লোগানগুলো ভালোভাবে পাঠ করা দরকার। তরুণদের এই স্লোগানগুলোর মধ্যে কেবল নিরাপদ সড়কের দাবিই নেই, পাশাপাশি রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্লেদগুলিও কিন্তু উঠে এসেছে। দেশের মাননীয়রা, কর্তাব্যক্তিরা যদি এই স্লোগানগুলোর মর্মার্থ উদ্ধার না করেন, আগামীতে সাবধান না হন, তাহলে কিন্তু এই তরুণরাই উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে দিতে পারে। আমি মন্ত্রী, আমি এমপি, আমি আমলা, আমি পুলিশ, কাজেই আমার যা খুশি তাই করার অধিকার আছে, ক্ষমতা ও দাপট দেখানোর সুযোগ আছে-এই মনোভাব দেখিয়ে চললে কিন্তু এমন বিদ্রোহ আবার ফিরে আসতে পারে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ, ফোরজি এগুলোর চেয়েও যে মানুষের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ- এটা তরুণরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ ওঠার আগে মানুষ যে নিরাপত্তা চায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি বুঝতে পারছেন?

এবারের এই নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে তরুণরা অনেক কিছু শিখিয়েছে। আন্দোলন কিভাবে করতে হয়, দাবিতে অটল থাকতে হয়, শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হয়। কোনো কাবাব-পরোটার আশা না করেই তারা সারাদিন না খেয়ে রোদে-পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় প্রতিবাদ করেছে। যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে। লাইসেন্স পরীক্ষা করেছে। দিনশেষে রাস্তার সব আবর্জনা পরিস্কার করে ঘরে ফিরছে।

ক্রমবর্ধমান জবাবদিহির অভাবে, কীভাবে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা, একটা প্রজন্ম, গত কয়েকদিন তার একটা উজ্জ্বল নমুনা স্থাপন করেছে। পুলিশ, মিলিটারি, মন্ত্রীরাও এসব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহি করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। আইন-ভাঙ্গার অপরাধ কবুল করেছে। রাস্তায় শিক্ষার্থীরা গাড়ির লাইসেন্স চেক করছে, আর পুলিশ আইন-ভঙ্গকারীদের একের পর এক শাস্তি দিচ্ছে, এ এক অকল্পনীয় দৃশ্য।

মন্ত্রীরাও রেহাই পাননি। পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর গাড়ির লাইসেন্স না থাকাতে ওই গাড়ি আটকে রাখে শিক্ষার্থীরা। রং-সাইড দিয়ে গাড়ি চালানোর জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকেও সোজা পথে চলতে বাধ্য করে শিক্ষার্থীরা। একজন সংসদ সদস্য ও আইনপ্রণেতা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে, জনভোগান্তি বাড়িয়ে ব্যস্ত রাস্তায় রং সাইড দিয়ে তাঁর গাড়ি দিয়ে যাওয়াটা গোটা জাতির জন্যই লজ্জাজনক।

দেশটা আসলে এভাবেই চলছে। যদি আইনপ্রণেতা, আইনের রক্ষক, আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যখন-তখন আইন না ভাঙতেন, তাহলে আমাদের এই প্রিয় স্বদেশটা হয়তো আরও অন্যরকম হতে পারত।

গত কয়েক দিনে ঢাকার রাজপথে যা ঘটেছে, এগুলো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এর ভেতরে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের গভীর বার্তা আছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বলে দিয়েছে, এখনকার এই ‘মগের মুল্লুক’ কিন্তু আর বেশি দিন চলবে না! সাধু সাবধান।

এখন পর্যন্ত তরুণরা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দাপুটে সব মন্ত্রী-পুলিশ-র‌্যাব-মিডিয়ায় জ্ঞানদানকারী নানা ব্যক্তিসহ সড়কে চলাচলকারী প্রত্যেকেই এই তারুণ্যের শক্তির কাছে ‘ধরা খেয়ে’ লজ্জিত হয়েছে চরমভাবে। সড়ক ও পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যগুলো চমৎকার ভাবে চিহ্নিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ‘ব্যবহারিক ক্লাস’ করে শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ব্যবস্থা (সিস্টেম) উন্নয়ন করতে হয়। প্রায় অথর্ব হয়ে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রচণ্ড শক্তিতে নাড়া দিয়েছে এই তারুণ্যের শক্তি। নীতিনির্ধারকরা পর্যন্ত নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন।

 

শিক্ষার্থীদের এই সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে কলঙ্কিত করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বরাবরই সোচ্চার ছিল, এখনও আছে। এই স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনা, উস্কানি এবং কোথাও কোথাও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে পুলিশের উপর হামলাসহ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যারা গণপরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে চলা মাফিয়া সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজির বহুপাক্ষিক সুবিধাভোগী, এই সুবিধাভোগীদের মনে ভয়, যদি সরকার এখন গণপরিবহনে সত্যিই নৈরাজ্য বন্ধের উদ্যেগ নেয়, গণপরিবহনের দানব গডফাদারের যদি পতন হয়, তাহলে চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটও বন্ধ হয়ে যাবে. এ কারণে এই বহুপাক্ষিক সুবিধাভোগী চক্রের গুণ্ডা-মস্তানরা পুলিশের উপর হামলা করে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য থেকে দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করেছে, মিরপুরে, শনির আখড়াতে এ্ররাই শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করেছে। মাফিয়াতন্ত্রের পোষ্যদের অপপ্রচার-অপকর্ম থেকে সাবধান থাকতে হবে সচেতন সবাইকে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কর্তব্য-কর্ম হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরিয়ে নেওয়া। শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের পাশাপাশি সরকারকেও এ ব্যাপারে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। পুলিশ-গুণ্ডা দিয়ে শিক্ষার্থীদের দমন করার উদ্যোগ নিলে কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই যেতে হবে শিক্ষার্থীদের কাছে। তাদের বোঝাতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে, শুধু দাবি-দাওয়াগুলো মেনে নেওয়ার ঘোষণা নয়, সুনির্দিষ্ট সময়, পদক্ষেপ ও ধাপগুলো বলতে হবে। যা করার করতে হবে এখনই। ইতিমধ্যে নানা অপশক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীরা মাঠে নেমে পড়েছে। গুজব ছড়িয়ে, সাবোটাজ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ধ্বংসাত্মক পথে নিয়ে যেতে, সরকারকে বিপদে ফেলতে জোর-তৎপরতা চালানো শুরু করেছে। এমন অবস্থায় সরকারের নমনীয়তা ও ত্বরিৎ উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে মন্ত্রিসভা থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দিতে হবে। ক্ষোভ প্রশমনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই করা দরকার।

মনে রাখতে হবে, এই আন্দোলনে অভিভাবকরাও আছে সন্তানদের পাশে। হাজারে হাজারে নয়, লাখে লাখে। বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। আর জামায়াত-শিবির ও বিএনপির দোহাই দিয়ে আন্দোলনকারীদের কলঙ্কিত করার গৎবাঁধা বুলি উচ্চারণও এই মুহূর্তে বন্ধ করতে হবে। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত এতো বড়ো আন্দোলন থেকে শিবির-বিএনপি যদি ফায়দা লুটতে পারে, তাহলে ক্ষমতাসীনরা পারে না কেন?

দাবি পূরণের যতো আশ্বাসই দেওয়া হোক না কেন, শাহজাহান খানকে মন্ত্রী রেখে সাধারণ মানুষের মন জয় করা যাবে না। যে ব্যক্তি সড়কনৈরাজ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে তার প্রতি নমনীয়তা সরকারের সকল সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কাজেই গলদ দূর করতে আন্তরিক হতে হবে। উইচহান্টিং করে লাভ হবে না। মনে রাখা দরকার যে, বেঁচে থাকার স্বার্থে পুরো শরীরকে ঠিক রাখতে কখনও কখনও কোনো বিশেষ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপারেশন করে কেটে ফেলতে হয়। এটাই স্বাস্থ্য সম্মত।

পরিস্থিতি কিন্তু অগ্নিগর্ভ। একটা ভুল সিদ্ধান্ত অনেক বড় সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাপক হিংসা ছড়িয়ে পড়ার আগে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, স্ফূলিঙ্গ কিন্তু ক্রমেই দাবানল হয়ে উঠছে!

ঔদ্ধত্য নয়, বিনয়; জেদ নয়, যুক্তিকে মেনে নিতে শিখতে হবে। ছাড় দেয়ার মানসিকতা লালন করতে হবে। পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী সংবেদনশীল উদ্যোগই হতে পারে এ মুহূর্তে সরকারের জন্য একমাত্র রক্ষাকবচ। মনে রাখতে হবে, শিশুরা চাইছে নিরাপদ সড়ক, সেটা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সরকারের। আর এটা তো শুধু শিশুদের দাবি নয়, এ দাবি সবার।