আত্মহত্যা রোধে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

183
 
– মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আনছারী
সম্প্রতি উত্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই অঞ্চলে বেশকিছু আত্নহত্যার মত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।যদিও সারাদেশেই অহরহ সংঘটিত হচ্ছে।বিশেষ করে যুবাদের ভেতর এটার প্রবণতা সবচেয়ে বেশী। সামান্য কারণে অতিরিক্ত ডিপ্রেশন/দুশ্চিন্তা কিংবা ব্যক্তিগত পারিবারিক সামাজিক বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে তারা এ পথ বেছে নিচ্ছে।
সমাজের এই দুরাবস্থা কেন হল কিংবা কী পরিত্রাণ সেই বিষয় নিয়েই আজকের আলোচনা।
এ কথা সত্য যে অনেক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও থেমে নেই আত্মহত্যা। বর্তমান সময়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডিয়ার থেকে আত্মহত্যা (Suicide) শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করে, তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। ডাক্তারগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে, প্রতিবছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। কিশোর-কিশোরী আর যাদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বেশী। পুরুষদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা নারীদের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ।
নানা কারণে লোকেরা আত্মহত্যা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার অনেক কারণ রয়েছে। যেমন: হতাশা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দাম্পত্য অথবা যেকোনো সম্পর্কের মাঝে দ্বন্দ্ব, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা ইত্যাদি। জীবনে চলার পথে নানাবিধ সমস্যা থাকবেই। এটা স্বাভাবিক। হতাশা কিংবা নিরাশা আসাটা অবাস্তব নয়। ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব উদ্বেগ বাড়িয়ে দেবে। সম্পর্কের টানাপোড়েনে জীবনের ইতি টানার চিন্তা করাটা কখনোই সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। মানসিকভাবে দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই বলে কী নিজেকে শেষ করে দেবো?
আল্লাহ তা’য়ালা মু’মীনদেরকে সতর্ক করে জানিয়ে দিয়েছেন: وَ لَا تَقْتُلُوْۤا اَنْفُسَكُمْؕ -এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।[ নিসা: ২৯]
রাসুলুল্লাহ (সা:) আত্মহত্যার ভয়াবহ পরিণতির বর্ণনা দিয়ে বলেছেন: যে কেউ পাহাড় থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ীভাবে পাহাড় থেকে পড়ার অনুরূপ শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের আগুনে বিষ পানের শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। আর যে কেউ কোনো ধারালো কিছু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের আগুনে তা দ্বারা শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। [বুখারী: ৫৭৭৮; মুসলিম: ১৭৫]
উল্লেখিত সমস্যায় সমাধানে সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর উপর ভরসা বাড়াতে হবে। প্রচেষ্টা জোরদার রাখতে হবে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব যেন কাউকে আতংকিত না করে। আল্লাহ তা’য়ালার ঘোষণা: এবং তিনি তাকে ধারণাতীত উৎস হতে রিযিক দান করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। হযরত উমর (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন: যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে পাখির মতো রিযিক দান করতেন। পাখি সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় উদরপূর্তি করে ফিরে আসে। [মুসনাদে আহমদ: ১/৩০, তিরমিযী: ২৩৪৪; ইবনে মাজাহ: ৪১৬৪] রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন: আমার উম্মত থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের অন্যতম গুণ হলো, তারা আল্লাহর উপর ভরসা করবে। [বুখারী: ৫৭০৫, মুসলিম: ২১৮; মুসনাদে আহমদ: ১/৪০১]
আল্লাহ তা’য়ালার সাহায্য পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো সবর করা। সূরা আল-বাকারাহ’র ১৫৩ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
হে ইমানদারগণ! তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।
তাফসিরে ইবনে কাসীরের বর্ণনায় এসেছে: যেসব বিপদ-আপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহর বিধান বলে মেনে নেয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশা রাখা (সবর)। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় সবরের তিনটি শাখা রয়েছে: এক. নফসকে হারাম এবং নাজায়েজ বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা দুই. ইবাদাত ও আনুগত্যে বাধ্য করা এবং তিন. যেকোনো বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা।
ব্যক্তির হতাশা দূরীকরণে নিজেকে প্রাণবন্ত রাখতে হবে। আল্লাহর স্মরণ হৃদয়ে সদা জাগরূক রাখা। মিলেমিশে চলাফেরার চেষ্টা করা। ব্যস্ত সময় কাটানো। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হলে নিজেকে তৈরী করা এবং পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা জোরদার রাখার বিকল্প নেই। দ্বন্দ্ব ও মতানৈক্য থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারস্পরিক সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষা করে চলা অপরিহার্য। অবৈধ সম্পর্ক বর্জন করা এবং বৈধ সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে নেতিবাচক ভূমিকা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা। সার্বিকভাবে ভালো ও সুস্থ থাকতে চাইলে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা অনস্বীকার্য।
মহান আল্লাহ তায়ালা সকল অপমৃত্যু,অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ মুসিবত থেকে আমাদের হেফাজত করুন।আমিন।
লেখকঃ

 মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আনছারী
খতীব,বারইয়ারহাট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ,চট্টগ্রাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here